তিন হাজার কোটি টাকার মহাকাশ স্বপ্ন
আয়ুষ্কালের অর্ধেক শেষেও বিতর্ক আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে
নকশাগত ত্রুটিতে আন্তর্জাতিক বাজারে পিছিয়ে
হাসনাইন ইমতিয়াজ
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৮:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
২০১৮ সালের ১২ মে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে মহাকাশে উড়াল দেয় বাংলাদেশের প্রথম নিজস্ব যোগাযোগ ও সম্প্রচার উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’, যার বর্তমান নাম বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১। উৎক্ষেপণের পর সরকার এটিকে দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রার মাইলফলক হিসেবে ঘোষণা করে। বলা হয়েছিল, এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি বিদেশে ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দিয়ে বড় অঙ্কের আয়ও হবে। কিন্তু আট বছর পরও প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প এখনও আর্থিকভাবে আত্মনির্ভর হতে পারেনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত নিট লাভ মাত্র ১১৩ কোটি টাকা। নকশাগত ত্রুটিতে আন্তর্জাতিক বাজারে পিছিয়ে পড়েছে এই স্যাটেলাইট। বাজার যাচাই ছাড়াই রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্পটি অনুমোদনের অভিযোগও উঠেছে। আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়েও রয়েছে বিতর্ক।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ নির্মাণ করে ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস কোম্পানি। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হয় প্রায় ২ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা। এর একটা বড় অংশ ঋণ নেওয়া হয় এইচএসবিসি ব্যাংকের মাধ্যমে।
স্যাটেলাইটের আয়ুষ্কাল ধরা হয় ১৫ বছর। ২০১২ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, সাত-আট বছরের মধ্যেই বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসবে। বাস্তবে দেখা যায়, উৎক্ষেপণের পরবর্তী দীর্ঘ সময়েও প্রত্যাশিত আয় আসেনি।
‘রাজনৈতিক প্রভাব’ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ
অন্তবর্তী সরকারের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার অনুসন্ধানে গঠিত টাস্কফোর্সের শ্বেতপত্রে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট নিয়ে অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, প্রকল্প অনুমোদনের সময় যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। আয়-ব্যয়ের বাস্তব হিসাব, বাজার বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়াই রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হয়। টাস্কফোর্সের ভাষায়, এটি ছিল ‘রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব’-এর উদাহরণ। শ্বেতপত্রে আরও বলা হয়, প্রকল্পটি মূলত রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীর আর্থিক সুবিধা নিশ্চিতের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল।
দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) স্যাটেলাইট প্রকল্পে অর্থ লোপাটের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। দুদকের প্রাথমিক অভিযোগে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জন্য উপযোগী ও কম দামি অরবিটাল স্লট না কিনে অনেক বেশি দামে স্লট কেনা হয়। যার ফলে রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
ভুল অরবিটাল স্লট নির্বাচন
স্যাটেলাইটটি ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জন্য ৮৮ থেকে ৯১ ডিগ্রি অরবিটাল স্লট বেশি কার্যকর হতো। খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, ১১৯.১ ডিগ্রিতে অবস্থানের কারণে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ডিটিএইচ ও ভিস্যাট সেবার গুণগত মান নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
নকশাগত ত্রুটি, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যর্থ
স্যাটেলাইটের অন্যতম সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে এর নকশাগত ত্রুটি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্যাটেলাইটের এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে ট্রান্সপন্ডার বিক্রিকে জটিল করে তুলেছে। স্যাটেলাইটের কে-ইউ ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার চারটি আলাদা ব্লকে বিভক্ত। একটি ব্লকের একটি ট্রান্সপন্ডার কোনো দেশে বিক্রি করা হলে একই ব্লকের বাকি ট্রান্সপন্ডারও সেই দেশে বিক্রি করতে হয়। চাহিদা না থাকলে বাকি অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়। এখনও ৩০ শতাংশ ট্রান্সপন্ডার অব্যবহৃত। এ ছাড়া উৎক্ষেপণের আগেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ফ্রিকোয়েন্সি সমন্বয় ও ‘ল্যান্ডিং রাইটস’ নিশ্চিত করার কথা ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্ভাবনাময় বাজারে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট প্রবেশ করতে পারেনি।
নাম মাত্র আয়
বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬ কোটি টাকা লোকসান দিয়ে যাত্রা শুরু করে বিএসসিএল। পরের বছর লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এরপর কয়েক বছর লাভ দেখায় কোম্পানিটি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৮৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা লাভ দেখায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আবার ৭৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা লোকসান হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৮ কোটি টাকা নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে। তবে এর বড় অংশ এসেছে এফডিআর ও ব্যাংক আমানতের সুদ থেকে।
তবে বিএসসিএলের আর্থিক হিসাব নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, কোম্পানিটি তার আর্থিক হিসাবে স্যাটেলাইটের অবচয়কে গণ্য করা হয়নি। ১৫ বছর আয়ুষ্কালে ২ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকার সম্পদের বিপরীতে বছরে অবচয় দাঁড়ায় প্রায় ১৯৮ কোটি টাকা। অবচয় হিসাবে নিলে প্রতিবছর লোকসান হওয়ার কথা কোম্পানিটির। কিন্তু বার্ষিক প্রতিবেদনে কয়েক বছর লাভ দেখানো হয়েছে।
সক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশ এখনও অব্যবহৃত
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ এর মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে বর্তমানে ২৬টি বাণিজ্যিকভাবে সক্রিয়। অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ সক্ষমতা এখনও অব্যবহৃত।
বিদেশের তুলনায় দেশের ভেতরে ব্যবসা তুলনামূলক ভালো। বর্তমানে ৬০টির বেশি টেলিভিশন চ্যানেল, পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, সিভিল এভিয়েশন, ব্যাংক, এনজিওসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিএসসিএলের সেবা ব্যবহার করছে। তবে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের বাজার ধরার চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি।
বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান বলেন, ‘মার্কেট যাচাই না করেই বেশি খরচে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। এখন আমাদের চেষ্টা হচ্ছে যতটুকু সম্ভব খরচ তুলে আনা। অব্যবহৃত সক্ষমতা বিক্রির জন্য আলাদা বাণিজ্যিক টিম গঠন করা হয়েছে।’
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকা অবশ্যই মর্যাদার বিষয়। কিন্তু প্রযুক্তিগত অর্জনের সঙ্গে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। বাজার, পরিকল্পনা ও নকশাগত প্রস্তুতি ছাড়া বড় প্রকল্প দীর্ঘ মেয়াদে বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে– বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ তার বাস্তব উদাহরণ। তিনি আরও বলেন, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর যে প্রযুক্তিগত জ্ঞানভিত্তি ও দেশীয় দক্ষ জনবল তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেটিও প্রত্যাশা অনুযায়ী গড়ে ওঠেনি।
- বিষয় :
- মহাকাশ
