ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সৃজনশীল অর্থনীতিতে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে সরকার

সৃজনশীল অর্থনীতিতে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে সরকার
×

 মেসবাহুল হক 

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৮:৪১ | আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ | ০৮:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’র বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতকে মূলধারার অর্থনীতিতে আনতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রথমবারের মতো এ খাতের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা, উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশে সহায়তার রূপরেখাও তৈরি করা হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে অর্থ বিভাগ সৃজনশীল অর্থনীতি নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণাপত্র তৈরি করেছে। সেখানে এ খাতকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির অন্যতম নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সৃজনশীল অর্থনীতি হবে আগামী বাজেটের অন্যতম চমক। 

সরকারের লক্ষ্য, আগামী কয়েক বছরে জিডিপিতে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং অন্তত ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। অর্থ বিভাগ মনে করছে, প্রচলিত শিল্প ও রপ্তানি খাতের বাইরে তরুণদের জন্য নতুন ধরনের অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করবে এ খাত।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন বাজেটে এ খাতের জন্য প্রাথমিকভাবে অন্তত ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার চিন্তা রয়েছে। আজ বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে আগামী বাজেটের আয়-ব্যয়ের একটি খসড়া রূপরেখা উপস্থাপন করবে অর্থ বিভাগ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিতব্য ওই বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনার ভিত্তিতে সৃজনশীল অর্থনীতি বিষয়ে বরাদ্দ চূড়ান্ত করা হবে। 

সৃজনশীলতা হবে নতুন অর্থনৈতিক শক্তি
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিটিএডি) বলছে, মানুষের সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি, জ্ঞান ও মেধাস্বত্বই সৃজনশীল অর্থনীতির প্রধান সম্পদ। তুলনামূলক কম অবকাঠামোনির্ভর এ খাত তরুণনির্ভর এবং উদ্ভাবনভিত্তিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলচ্চিত্র, সংগীত, অনলাইন কনটেন্ট, অ্যানিমেশন, গেমিং, ভিএফএক্স, সফটওয়্যার, গ্রাফিক ডিজাইন, ফ্যাশন, লোকসংস্কৃতি, হস্তশিল্প, সাংস্কৃতিক পর্যটন, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক কনটেন্টকে সৃজনশীল অর্থনীতির আওতায় আনা হবে।

জানা গেছে, আঞ্চলিক তথা জেলা পর্যায়ে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ গড়ে তোলা, পারফরম্যান্সভিত্তিক অনুদান চালু এবং ‘বাংলাদেশ ক্রিয়েটিভ ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ নামে একটি বিশেষ সংস্থা গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সৃজনশীল সক্ষমতা তুলে ধরতে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ নামে জাতীয় ব্র্যান্ডিং উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে সম্পৃক্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের তরুণদের সৃজনশীল সক্ষমতা এখন বড় অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে। শুধু চাকরির বাজার নয়; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক বৈশ্বিক বাজারেও বড় সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

বাজেটে যেসব সুবিধা থাকতে পারে
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে সৃজনশীল অর্থনীতি খাতে বিশেষ স্টার্টআপ ফান্ড, সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ সহায়তা এবং প্রযুক্তি অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ রাখা হতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চগতির ইন্টারনেট, ডিজিটাল মনিটাইজেশন ব্যবস্থা এবং কনটেন্টভিত্তিক ই-কমার্স সুবিধা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অর্থ বিভাগ মনে করছে, বর্তমানে দেশে অসংখ্য তরুণ ইউটিউব, ফেসবুক, ফ্রিল্যান্সিং, গেম ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল ডিজাইন ও অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাদের বড় অংশ এখনও আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে রয়েছে। নীতিগত স্বীকৃতি পেলে এ খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে।

অর্থ বিভাগের এ সংক্রান্ত উপস্থাপনায় আরও বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এ খাতে অর্থায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে সরকার সরাসরি ঋণনির্ভর প্রকল্পের বদলে বাজারভিত্তিক টেকসই অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তুলতে চায়। পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহজ অর্থায়ন এবং বিশেষ ভেঞ্চার বা স্টার্টআপ ফান্ড গঠনের সুপারিশও করা হয়েছে।

বিশ্বে দ্রুত বাড়ছে 
বিশ্বব্যাপী সৃজনশীল অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয় এবং এ খাতে অন্তত ৫ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। ২০২২ সালে বৈশ্বিক সৃজনশীল সেবার রপ্তানি দাঁড়ায় প্রায় ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে সৃজনশীল পণ্যের রপ্তানি ছিল ৭১৩ বিলিয়ন ডলার। উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও সৃজনশীল সেবার রপ্তানি দ্রুত বাড়ছে। ২০১০ সালে যেখানে এ খাতের অংশ ছিল ১০ শতাংশ; ২০২০ সালে তা বেড়ে ২০ শতাংশে পৌঁছেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জিডিপিতে এ খাতের অবদানও উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান ৪ দশমিক ২ শতাংশ, ফিলিপাইনে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ভারতে ২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ।
অর্থ বিভাগ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষিণ কোরিয়া যেভাবে চলচ্চিত্র ও ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, বাংলাদেশও সঠিক নীতি-সহায়তা পেলে অনুরূপ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বাংলা ভাষাভিত্তিক ডিজিটাল কনটেন্ট, লোকসংস্কৃতি, ফ্যাশন ও গেমিং শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

রয়েছে চ্যালেঞ্জ
এ খাতের বিকাশে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অর্থ বিভাগ মেধাস্বত্ব সুরক্ষার দুর্বলতা, পাইরেসি, নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা, অর্থায়নের সংকট, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সীমিত প্রবেশাধিকারকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
উচ্চমানের স্টুডিও, প্রডাকশন সুবিধা ও ডিজিটাল অবকাঠামোর অভাবও বড় সমস্যা। পাশাপাশি দেশে এখনও সৃজনশীল শিল্পের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান না থাকায় এ খাতের প্রকৃত অবদান নিরূপণ কঠিন হয়ে পড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের আশা, জাতীয় বাজেটে আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সৃজনশীল অর্থনীতি ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হবে। বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচিতি বাড়াতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এদিকে বিভিন্ন খাতে বাড়তি ভর্তুকির চাপ, প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে বিপুল অর্থ প্রয়োজন। 

 

আরও পড়ুন

×