হামের উচ্চ সংক্রমণ থাকতে পারে আরও দুই-তিন সপ্তাহ
আরও ৮ শিশুর মৃত্যু, মোট ৪৩২
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ০৮:৩৬ | আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ | ১২:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণের হার নিম্নমুখী হতে পারে। সম্প্রতি যেসব শিশু হাম-রুবেলা টিকা পেয়েছে, তাদের শরীরে এখনও পূর্ণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি। ফলে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে।
গতকাল বুধবার দুপুরে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন উপলক্ষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আমরা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। ২০২৬ সালে এসে হামে এত শিশুর প্রাণ হারানো আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।
জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, গত ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া টিকাদান কর্মসূচির পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে অন্তত তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে। ফলে টিকা নেওয়ার পরপরই কোনো শিশু ভাইরাসের সংস্পর্শে এলে সে আক্রান্ত হতে পারে। তিনি বলেন, যারা এপ্রিলের শুরুতে টিকা পেয়েছে, তাদের শরীরে এখন সুরক্ষা তৈরি হয়েছে। তাই আমরা আশা করছি, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণ কমতে শুরু করবে।
নিউমোনিয়া ও অপুষ্টিকেই দায়ী করলেন বিশেষজ্ঞরা
শিশুমৃত্যুর কারণ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বিশেষ সহকারী বলেন, নিশ্চিত ও সন্দেহজনক দুই ধরনের মৃত্যুর ক্ষেত্রেই বেশির ভাগ শিশুর জটিলতার মূল কারণ ছিল নিউমোনিয়া। পাশাপাশি মৌসুমি আবহাওয়া পরিবর্তন ও জনাকীর্ণ পরিবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তিনি বলেন, যেসব শিশু মারা যাচ্ছে, তাদের বড় একটি অংশ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল। অপুষ্টির কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা হাম ও এর জটিলতায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। শুধু টিকাদান নয়, শিশুদের পুষ্টিমান বাড়ানোর জন্যও সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি প্রয়োজন। দেশের শিশুরা যদি সঠিকভাবে সুপুষ্ট হতো, তাহলে মৃত্যুর সংখ্যা এত বেশি হতো না।
স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশ বরাদ্দের পরিকল্পনা
সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। তবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আসন্ন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত অর্থবছরে এ হার ছিল শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ। তিনি জানান, দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ইতোমধ্যে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় শতভাগ। প্রথম ধাপের এলাকায় সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে দাবি করে অভিভাবকদের প্রতি তিনি বলেন, নিয়মিত ইপিআই কর্মসূচির আওতায় দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুরাও যেন চলমান ক্যাম্পেইনে হাম-রুবেলা টিকা নেয়।
হাসপাতালে ভর্তি দেড় হাজার
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৪৮৯ শিশু। নতুন করে হাম শনাক্ত হয়েছে ১২৬ জনের। এ পর্যন্ত সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৩৮ হাজার ৫৪ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৩৩ হাজার ৮৩ জন।
গত ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত হাম পরিস্থিতির তথ্য প্রকাশ করছে। সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ৬৯ জনের। সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে আরও ৩৬৩ জনের। সব মিলিয়ে মারা গেছে ৪৩২ শিশু। এ সময়ে হামের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৫৩ হাজার ৫৬ জন এবং শনাক্ত হয়েছে সাত হাজার ১৫০ জন।
অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে ১৪৩ জন। এরপর রাজশাহী বিভাগে মারা গেছে ৭৮ শিশু। আক্রান্তের সংখ্যাও বেশি এ দুই বিভাগে। ঢাকায় আক্রান্ত চার হাজার ৮৮৫ জন এবং রাজশাহীতে এক হাজার ১০৭ জন।
