সারা বছরই আয়কর দেওয়া যাবে, মিলবে প্রণোদনা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ | ০৮:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
কর অব্যাহতি বেশি হওয়ায় রাজস্ব আয় কমছে। তাই আগামী বাজেটে কর হার না বাড়িয়ে করদাতার সংখ্যা বাড়াতে চায় এনবিআর। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বিশেষ সুবিধায় সারা বছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ, আয়কর দেওয়ার প্রচলিত ৩০ নভেম্বরের সময়সীমা আর থাকবে না। সারা বছরই আয়কর দেওয়া যাবে। এতে করদাতারা সময়মতো রিটার্ন দাখিল করবেন এবং রিটার্ন দাখিল সংখ্যা বাড়বে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন জমা দিলে করদাতাকে ‘প্রণোদনা’ দেওয়া হবে– আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। মূলত নিয়মিত ও সৎ করদাতাকে উৎসাহিত করতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে রিটার্ন দাখিলের সময়কে কয়েক ভাগে ভাগ করা হবে। সেই ভাগ অনুযায়ী প্রণোদনা পাবেন করদাতারা। বিশেষ করে প্রথম প্রান্তিকে যারা আয়কর রিটার্ন জমা দেবেন, তাদের কর প্রণোদনা অর্থাৎ করদাতার রিটার্নের ওপর করছাড় দেওয়া হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে যারা রিটার্ন দেবেন, তারা কম প্রণোদনা পাবেন। তৃতীয় পর্যায়ে যারা দেবেন, তারা প্রণোদনা পাবেন না। তবে তাদের জরিমানা গুনতে হবে না। চতুর্থ ধাপে হয়তো জরিমানা আরোপ হতে পারে। এই প্রক্রিয়াতেই সারা বছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা করছে এনবিআর। তবে কত শতাংশ ছাড় বা প্রণোদনা দেওয়া হবে, তা চূড়ান্ত করা হয়নি।
বর্তমানে সময়মতো রিটার্ন দাখিল করলে সরাসরি কোনো নগদ টাকা বা আর্থিক প্রণোদনা পাওয়া যায় না। তবে সময়মতো এবং নিয়মিত রিটার্ন জমা দিলে আইনগতভাবে অনেক বড় সুবিধা, ছাড় এবং জরিমানা থেকে রেহাই পাওয়া যায়, যা প্রকারান্তরে একটি বড় আর্থিক সাশ্রয় বা প্রণোদনা হিসেবেই কাজ করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, করদাতাদের রিটার্ন দাখিলে উৎসাহ দেওয়ার জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, একজন করদাতার ওপর প্রযোজ্য কর হলো পাঁচ হাজার টাকা এবং তিনি প্রথম ধাপে ই-রিটার্ন দাখিল করলেন। এতে তাকে হয়তো ২০০ টাকা প্রণোদনা দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ, ওই করদাতাকে পরিশোধ করতে হবে চার হাজার ৮০০ টাকা। এভাবে দ্বিতীয়-তৃতীয় ধাপেও প্রণোদনা থাকতে পারে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছরই আয়কর রিটার্ন দাখিলের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর একাধিক দফায় সময় বাড়ানো হয়। চলতি ২০২৫-২৬ করবর্ষেও স্বাভাবিক নিয়মে রিটার্ন জমার শেষ সময় ছিল ৩০ নভেম্বর। কয়েক দফায় সময় বাড়িয়ে শেষে তা ৩১ মার্চ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এমনকি কোম্পানি করদাতাদের জন্যও সময় বাড়িয়ে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল। সময় বাড়ানোর পরও করদাতারা সময়মতো রিটার্ন দাখিল করেনি।
করদাতাদের বড় অংশের মধ্যে শেষ মুহূর্তে রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এর ফলে শেষদিকে এনবিআরের সার্ভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এতে ভোগান্তি কমাতে বারবার সময় বাড়ানো হয়। এ ছাড়া ব্যবসায়ী সংগঠন, আয়কর আইনজীবী সমিতিসহ পেশাজীবী সংগঠনগুলোর অনুরোধে সময় বাড়াতে হয়। করদাতাদের আইনি জটিলতা ও জরিমানা থেকে বাঁচাতে এনবিআর সাধারণত এই অনুরোধগুলো বিবেচনা করে। আয়কর আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের পরও করদাতাদের রিটার্ন দাখিলের সময় দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বারবার সময় বাড়ানোর প্রক্রিয়াটি করদাতাদের সাময়িক স্বস্তি দিলেও কর খাতের কাঠামোগত শৃঙ্খলা এবং যথাসময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
এর আগে এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছিলেন, যারা নিয়মিত, সৎভাবে এবং কোনো জটিলতা ছাড়া অনলাইনে রিটার্ন জমা দেবেন, তাদের জন্য বিশেষ পুরস্কার বা প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকবে। এর আওতায় করদাতারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি বিশেষ মর্যাদা বা সুবিধা পাবেন।
এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ছোট করদাতাদের রিটার্ন নেটে আনা ভালো উদ্যোগ হলেও মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রকৃত সম্পদ ও করযোগ্যদের করজালে আনা।
তিনি বলেন, মোট ৪৪ লাখ রিটার্নের প্রায় অনেকেই শূন্য ও প্রান্তিক হওয়ায় এদের থেকে রাজস্ব আদায় নগণ্য, অথচ ডেটাবেজ ও প্রশাসনিক ব্যয় রয়েছে। তবে ছোট এই করদাতারাই ভবিষ্যতের বড় করদাতা হয়ে উঠবে। তাই দীর্ঘমেয়াদে উদ্যোগটি ইতিবাচক হলেও প্রকৃত বড় করদাতাদের চিহ্নিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এই উদ্যোগে খুব বেশি লাভ হবে বলে মনে করেন না এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন। সমকালকে তিনি বলেন, এর আগে করমেলা করা হয়েছে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে। তাতে খুব বেশি আয়কর আদায় হয়নি। মূলত লক্ষ্য হওয়া উচিত করযোগ্যদের খুঁজে বের করা।
এনবিআরের তথ্যমতে, বর্তমানে ই-টিআইএনধারী করদাতার সংখ্যা এক কোটি ১২ লাখ। ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য ২০২৫-২৬ করবর্ষের রিটার্ন জমার সর্বশেষ সময়সীমা ছিল চলতি বছরের ৩১ মার্চ। ৩১ মার্চ পর্যন্ত ই-রিটার্ন সিস্টেমে ৫০ লাখ করদাতা রিটার্ন দাখিল করতে নিবন্ধন করেছেন। ৪২ লাখ ৫০ হাজার করদাতা ই-রিটার্ন দাখিল করেছেন।
- বিষয় :
- প্রণোদনা
