নিরাপত্তায় প্রাধান্য দিয়ে নৌপথে ঈদযাত্রার সার্বিক প্রস্তুতি
ছবি-সংগৃহীত
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৮:২৭ | আপডেট: ২২ মে ২০২৬ | ১৩:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঈদুল ফিতরের আগে গত ১৮ মার্চ রাজধানীর সদরঘাটে লঞ্চ দুর্ঘটনায় দুজনের মৃত্যু হয়। ওই দিন বিকেলে এমভি আসা-যাওয়া-৫ লঞ্চে অবৈধভাবে ট্রলারের মাধ্যমে যাত্রী ওঠানোর সময় এমভি জাকির সম্রাট-৩ নামের আরেকটি লঞ্চ ধাক্কা দেয়। দুই লঞ্চের মাঝে পিষ্ট হয়ে ও পানিতে পড়ে মারা যান বাবা-ছেলে।
এই ঘটনায় তখন ব্যাপক সমালোচনা হয়। ঈদুল আজহার নৌযাত্রায় এমন ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য কঠোর অবস্থান নিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। নৌপথে যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ ও একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে চলন্ত বা নোঙর করা লঞ্চে নৌকা কিংবা ট্রলার থেকে যাত্রী ওঠানামা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। লঞ্চের পেছন বা পাশ দিয়ে এবং নদীর মাঝপথে ট্রলার বা নৌকা ভেড়ানোও যাবে না।
এ ছাড়া সদরঘাটসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব লঞ্চ ও নৌঘাটে নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। ঘাটগুলোতে নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ড মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সার্বক্ষণিক নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমও চলবে। ঈদে ঘরমুখী মানুষের স্বস্তির যাত্রা নিশ্চিতে আগামী রোববার থেকে শুরু হচ্ছে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস, যা চলবে ২৭ মে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত। ঈদুল ফিতরে চালু হওয়া নতুন দুটি লঞ্চঘাট থেকেই এবারও এই বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস পরিচালনা করা হবে। লঞ্চের সংখ্যাও গত ঈদের তুলনায় দ্বিগুণ অর্থাৎ ছয়টি থেকে বাড়িয়ে ১২টি করা হয়েছে।
নিরাপত্তার যত আয়োজন
কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, লঞ্চ টার্মিনাল ও ঘাটগুলোতে দুর্ঘটনা এড়াতে কেবল বিআইডব্লিউটিএ নির্ধারিত টার্মিনাল পন্টুন ব্যবহার করে লঞ্চে যাত্রী ওঠানামা করাতে
হবে। ঘাটগুলোতে বার্থিং করা (বাঁধা) লঞ্চের পেছন বা পাশ দিয়ে এবং নদীর মাঝপথে ট্রলার বা নৌকা থেকে যাত্রী ওঠানো-নামানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
বিশেষ করে ঢাকা নদীবন্দরের সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের বিপরীত দিক তথা কেরানীগঞ্জ থেকে লঞ্চের সঙ্গে ট্রলার ভিড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ থাকবে। আর সেখানে বিআইডব্লিউটিএর নবনির্মিত ট্রলার ঘাটে নৌকা ও ট্রলারের যাত্রীরা ওঠানামা করতে পারবেন।
নিয়ম অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট লঞ্চের যাত্রা বাতিল এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হবে। নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়নে নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ড ২৪ ঘণ্টাই নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালন করবে। কেরানীগঞ্জ থেকে অবৈধভাবে লঞ্চে ট্রলার ভেড়ানো বন্ধে নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের সঙ্গে ঢাকা জেলা পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
এদিকে, সব ঘাট থেকে আবহাওয়া দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে এবং তাদের নির্দেশনা মেনে লঞ্চ চলাচলের অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কন্ট্রোল রুমের অনুমতি ছাড়া কোনো লঞ্চ ঘাটে প্রবেশ বা বার্থিংও করতে পারবে না।
যাত্রীদের অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণে যাত্রী পূর্ণ হওয়ামাত্রই লঞ্চ ছেড়ে যেতে হবে। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, ছাদে যাত্রী ওঠানো কিংবা সিরিয়াল ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট লঞ্চের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। প্রতিটি লঞ্চে অন্তত চারজন করে আনসার সদস্য থাকবেন। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া যাবে না।
দুর্ঘটনায় উদ্ধার কার্যক্রম সহজ করতে প্রতিটি নৌযানে নির্দিষ্ট ধরনের নিরাপত্তা বয়া ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি নৌচ্যানেল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে মার্কিং দৃশ্যমান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঈদের আগের পাঁচ দিন এবং পরের পাঁচ দিন অর্থাৎ ২৩ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত বালুবাহী সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে। এই সময়ে বালু উত্তোলন বন্ধ রাখার জন্যও সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাতে স্পিডবোট চলাচল বন্ধ থাকবে। সদরঘাট এলাকায় ডিঙি নৌকা চলাচল এবং নৌচ্যানেলে মাছ ধরার জাল পাতাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বছিলা ও শিমুলিয়া ঘাট থেকেই বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস
ঈদুল ফিতরে চালু হওয়া নতুন দুটি ঘাট অর্থাৎ রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলা লঞ্চঘাট (ল্যান্ডিং স্টেশন) এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজসংলগ্ন শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাট থেকেই বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস পরিচালনা করা হবে।
আগামী ২৪-২৭ মে চালু থাকা এই বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসের আওতায় বছিলা ঘাট থেকে ৯টি লঞ্চ এবং শিমুলিয়া ঘাট থেকে দুটি লঞ্চ ও একটি ফেরি চলাচল করবে। বছিলা লঞ্চঘাট থেকে কেবল ঈদের সময় নয়, সারাবছরই লঞ্চ সার্ভিস চালু থাকবে, যার উদ্বোধনও হবে আগামী রোববার।
নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সমকালকে বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য, ঈদে যেন ঘরমুখী মানুষের নৌভ্রমণ আরামদায়ক, স্বস্তিদায়ক, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল হয়। তাই গত ঈদের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনাসহ সামগ্রিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার নৌপথের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
অতীতের ভুলত্রুটি সংশোধন করে নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে অধিকতর সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি আমরা।’
- বিষয় :
- ঈদযাত্রা
