ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পাহাড়ি কৃষিতে প্রযুক্তির ছোঁয়া

পাহাড়ি কৃষিতে প্রযুক্তির ছোঁয়া
×

বান্দরবানের বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারে নির্মাণ হচ্ছে বিশ্বমানের আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি। গত বৃহস্পতিবার তোলা -সমকাল

 জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৯:২৬ | আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ | ১১:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাঙ্গু নদীর স্বচ্ছ জলধারা ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে। নদীর ওপারে সারি সারি সবুজ পাহাড়। কোথাও মেঘের ছায়া, কোথাও রোদের ঝিলিক। পাহাড়ি বাতাসে দুলছে গাছপালা, দূর থেকে আসে পাখির ডাক। এই প্রকৃতির মাঝে হঠাৎ চোখে পড়ে আধুনিক স্থাপত্যের এক ব্যতিক্রমী নির্মাণ। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, সবুজ পাহাড়ের বুকেই বসে আছে কোনো আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম।

বান্দরবানের সদর উপজেলার বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারে নির্মাণাধীন গোলাকার এই ভবন এখন স্থানীয়দের কৌতূহলের কেন্দ্র। সাঙ্গু নদী, পাহাড় আর সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া এর নান্দনিক অবয়ব সহজেই নজর কাড়ে। তবে এটি কোনো পর্যটনকেন্দ্র কিংবা বিলাসবহুল রিসোর্ট নয়। এটি হতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম আধুনিক প্লান্ট টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি। যাকে ঘিরে পাহাড়ি কৃষিতে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন কৃষিবিদরা।

ভবনটির সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক এর নির্মাণশৈলী। জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘নিউক্লিয়াস’ বা কোষকেন্দ্রের আদলে পুরো ভবনটির নকশা করা হয়েছে। স্থাপনাটির নকশায় আধুনিকতা ও পরিবেশবান্ধব ভাবনার সমন্বয় রাখা হয়েছে। সিরামিক ব্রিক ও আয়রন চিপস দিয়ে নির্মিত ভবনের চারপাশ ও ওপরের অংশ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করতে পারে। ফলে ভেতরে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কমবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত এ ভবনের ভেতরে থাকছে আধুনিক মিডিয়া প্রস্তুতি রুম, ইনোকুলেশন বা ট্রান্সফার রুম, কালচার বা গ্রোথ রুম, অ্যাক্লাইমেটাইজেশন ও হার্ডেনিং জোন, গ্লাস হাউস এলাকা এবং গবেষণা ও প্রশিক্ষণের বিশেষায়িত সুবিধা। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব অবকাঠামোই এখানে রাখা হচ্ছে।

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, টিস্যু কালচার ল্যাবে খুব অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ রোগমুক্ত ও জেনেটিকভাবে অভিন্ন চারা উৎপাদন সম্ভব। এতে উৎপাদন বাড়বে, রোগের ঝুঁকি কমবে এবং কৃষকের খরচ কমে আসবে।
বান্দরবান সদর উপজেলার রাজবিলা এলাকার কৃষক নিংসাথুই মারমা বলেন, আমরা অনেক সময় বাইরে থেকে চারা কিনে আনি। কিন্তু অনেক চারাই ঠিকমতো হয় না, রোগ হয়, গাছ মারা যায়। এই ল্যাবরেটরিতে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির চারা পাওয়া গেলে পাহাড়ের কৃষকরা অনেক উপকার পাবেন।

সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের নারী কৃষক নাগছবি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, এই ল্যাব হলে নারীরাও নতুনভাবে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করতে পারবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানে পাহাড়ি উপযোগী ফসল নিয়ে গবেষণা, নতুন জাত সংরক্ষণ, মাতৃগাছ উন্নয়ন এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজও করা হবে। 
টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, আমরা ভবিষ্যতের কৃষির জন্য জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছি। পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষকদের জন্য রোগমুক্ত ও মানসম্মত চারা নিশ্চিত করা, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা এবং গবেষণাকে মাঠমুখী করাই মূল লক্ষ্য।

বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক লিটন দেবনাথ জানান, ভবনের কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশ মাথায় নিয়ে ভবনের নির্মাণ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষিবিজ্ঞানী ড. এম এ রহিম বলেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, মানসম্পন্ন ও রোগমুক্ত উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। টিস্যুকালচার প্রযুক্তি সেই সুযোগ তৈরি করছে।

আরও পড়ুন

×