ক্রিপ্টোকারেন্সি, পলিমার্কেটেও ‘ট্রাম্প মহিষ’
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ | ০৩:৪৬ | আপডেট: ০১ জুন ২০২৬ | ১৪:০০
নারায়ণগঞ্জের ৭০০ কেজি ওজনের সেই অ্যালবিনো মহিষ ক্রিপ্টোকারেন্সির জগতেও দাপট দেখিয়েছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মহিষটির নামে চালু হয়েছে একটি মিমকয়েন ও টোকেন। গতকাল রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার আগের ২৪ ঘণ্টার টোকেনটির দাম বেড়েছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামানুসারে মহিষটির নামকরণের পরই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয় ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প মহিষ’ বা ‘বাফেলো ডোনাল্ড ট্রাম্প’। এই নাম ধরেই ‘বাফডন’ বা বাফেলো ডোনাল্ড নামে মিমকয়েন ও টোকেন চালু হয় ক্রিপ্টোকারেন্সির সোলানা ব্লকচেইনে।
ক্রিপ্টোকারেন্সির ডেটা বিশ্লেষণকারী প্ল্যাটফর্ম ‘কয়েনগেকোর’ তথ্য বলছে, রোববার সন্ধ্যায় বাফেলো ডন-এর বাজার মূলধন ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭২৫ ডলার। বাজারে এই কয়েনের র্যা ঙ্কিং ৫ হাজার ১৬০ নম্বরে। লেনদেনযোগ্য বাফডন টোকেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৩ কোটি।
ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজার সম্পর্কে ধারণা রাখেন একটি গণমাধ্যমের সাংবাদিক তৌহিদুল ইসলাম তুষার। তিনি বলেন, ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে সাধারণত ‘হাইপ’ তৈরির জন্য এ ধরনের মিমকয়েন বা টোকেন চালু করা হয়। এই টোকেনের কোনো আর্থিক মূল্য নেই। তবে এটিকে কেন্দ্র করে যে কমিউনিটি গড়ে ওঠে, সেটি এক সময় বাজারে আর্থিক মূল্য থাকা কারেন্সির (যেমন বিটকয়েন) লেনদেনের ওপর প্রভাব ফেলে।
সম্প্রতি বাফডন মিমকয়েনটির একটি ওয়েবসাইটও চালু হয়েছে। যেটির স্লোগান হিসেবে লেখা– ‘মেক বাফেলোস গ্রেট অ্যাগেইন’। বলা হয়েছে, এটি ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন পরিচালনার ব্লকচেইন সোলানার ব্যবহারকারীদের দ্বারা চালিত একটি মিমকয়েন। বাস্তব জীবনে এর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উপযোগিতা বা কার্যকারিতা নেই। এটি মূলত একটি মিম, ট্রেন্ড ও কেবলই বিনোদনের অংশ।
তবে কয়েনগেকোর তথ্য অনুযায়ী, রোববার মার্কিন ডলারে একটি বাফডন টোকেনের বাজারমূল্য ছিল ০ দশমিক ০০০১৭৩৫ ডলার। ক্রিপ্টোকারেন্সির সবচেয়ে জনপ্রিয় মুদ্রা বিটকয়েনের বিপরীতে বাফডনের দাম ২৪ ঘণ্টায় বেড়েছিল ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে রাত ৯টার পর থেকেই এই দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমতে থাকে।
মিমকয়েনের মূল্য নির্ধারণের বিষয়টির একটি ব্যাখ্যা আছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির রুটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলের এক নিবন্ধে। তারা বলছে, বিটকয়েন বা অন্যান্য মূলধারার ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলোকে উপহাস করার জন্য সাধারণত মিমকয়েন তৈরি করা হয়। আর তখনই এর একটি কাল্পনিক মূল্য ধরা হয়। অর্থনৈতিক বা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে অধিকাংশ মিমকয়েনের নির্দিষ্ট উপযোগিতা থাকে না। এগুলো শুধু লেনদেনের জন্য টিকে থাকে।
২০২২ সালের মার্চ মাসের হিসাব অনুযায়ী, বাজারে ২০০টিরও বেশি মিমকয়েন আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ‘ডজকয়েন’। একটি কুকুরের মিম থেকে এই কয়েনের নামকরণ করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আর্থিক মূল্য না থাকলেও মানুষ মিমকয়েন কেন কেনে?
রুটগার্স বিজনেস স্কুলের নিবন্ধে বলা হয়েছে, যে কোনো পণ্য বা সেবার প্রকৃত মূল্য থাকার জন্য অর্থনৈতিক ভিত্তি ও ব্যবহারের উপযোগিতা থাকা আবশ্যক। মিমকয়েনগুলো সামাজিক মাধ্যমের ট্রেন্ড দ্বারা চালিত হওয়ায় একসময় এগুলোর হাইপ বা জনপ্রিয়তা শেষ হয়ে যায়। তবে সাম্প্রতিক কিছু প্রবণতা দেখাচ্ছে, কোনো কোনো মিমকয়েনের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বলও হতে পারে। এর মধ্যে বড় প্রবণতা হলো, ক্রমবর্ধমান হারে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মিমকয়েনকে পেমেন্ট বা মূল্য পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের পেশাদার বাস্কেটবল দল ‘ডালাস ম্যাভেরিক্স’-এর মালিক মার্ক কিউবান ২০২১ সালের মার্চ মাসে বলেছিলেন, তাদের ম্যাচের টিকিট বা জার্সির মতো পণ্যগুলো কেনার জন্য ‘ডজকয়েন’ গ্রহণ করা হবে।
রুটগার্স বিজনেস স্কুলের নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, ডালাস ম্যাভেরিক্সের মতো ইলেকট্রনিক্স পণ্যের প্রতিষ্ঠান গেমস্টপ, আমেরিকান ডিপার্টমেন্টাল স্টোর নর্ডস্ট্রম, ইলন মাস্কের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার মতো প্রায় ১০টি কোম্পানি ইতোমধ্যে ডজকয়েন-এর মতো মিমকয়েনগুলোকে পেমেন্ট হিসেবে গ্রহণ করছে।
কেন বাফডন তৈরি হলো?
মিমকয়েনটির ওয়েবসাইটেই বলা হয়েছে, এটি বাংলাদেশসহ বিশ্বে ভাইরাল হওয়া সোনালি চুলের মহিষ থেকে অনুপ্রাণিত। এই মহিষটির খবর মূলত দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের বদৌলতেই এক্স, ফেসবুক, রেডিট, ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে।
গুগল সার্চ রেজাল্টে গত ১২ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষকে নিয়ে ৬ লাখের বেশি কনটেন্ট পাওয়া গেছে। অধিকাংশই দেশি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন। ফেসবুকে তৈরি করা রিলসও এর অন্তর্ভুক্ত।

ইংরেজিতে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প বাফেলো বাংলাদেশ’ লিখে গুগলে সার্চ করে ১২ মে থেকে ২৬ মে পর্যন্ত দেশি-বিদেশি কনটেন্ট পাওয়া গেছে ২ লাখ ৩৫ হাজার। মহিষটি কোরবানি দেওয়া বন্ধ করার পর ২৭ থেকে ২৯ মে পর্যন্ত একই কিওয়ার্ড ব্যবহার করে কনটেন্ট পাওয়া গেছে ২ লাখ ৩৮ হাজারটি। শুধু ঈদের দিন মহিষটি নিয়ে প্রকাশিত কনটেন্টের সংখ্যা ৮৭ হাজার ৬০০টি।
বাংলায় ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প মহিষ’ লিখে সার্চ করে ১২ মে থেকে ২৬ মে পর্যন্ত কনটেন্ট পাওয়া গেছে ৭৭ হাজার ৭০০টি। ২৭ থেকে ২৯ মে পর্যন্ত একই কিওয়ার্ডে পাওয়া গেছে ৬৫ হাজার ২০০টি। ঈদের দিন প্রকাশিত কনটেন্টের সংখ্যা ২১ হাজার ৭০০টি।
বাফডনের ওয়েবসাইটে লেখা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মহিষটির নাম জুড়ে দেওয়ার এই অদ্ভুত ও মজার মেলবন্ধনটি ক্রিপ্টো দুনিয়ার বিনোদনপ্রেমী ও ট্রেন্ড-অনুসারী ট্রেডারদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এটিই নতুন মিমকয়েন চালুর অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
উল্লেখ্য, ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল নামে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের মালিকানাধীন ক্রিপ্টোকারেন্সিকেন্দ্রিক একটি উদ্যোগ আছে। সিএনএনের তথ্যানুযায়ী, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফও সেটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।
প্রেডিকশন মার্কেটেও মহিষ
বাজার, খেলার ফলাফল, ক্রিপ্টোকারেন্সি বা আলোচিত কোনো বিষয় নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করার একটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ‘পলিমার্কেট’। ২৮ মে এই প্ল্যাটফর্মের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টেও নারায়ণগঞ্জের মহিষকে নিয়ে একটি পোস্ট দেওয়া হয়।

পলিমার্কেট লিখেছে, ‘সরকারি হস্তক্ষেপে বাংলাদেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প নামে একটি মহিষ এইমাত্র কোরবানির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।’ প্ল্যাটফর্মটির ব্যবহারকারীরা মহিষটি কোরবানি হওয়া নিয়ে কোনো বাজি ধরেছিলেন কিনা– জানা যায়নি। তবে ওই পোস্টের কয়েকটি কমেন্টে ‘বাফডন’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ‘এইস’ নামে একটি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে কমেন্ট করা হয়েছে, ‘সেন্ড দ্য বাফডন’। এই অ্যাকাউন্টে গিয়ে বেশ কয়েকটি পোস্ট পাওয়া গেছে, যেগুলো ক্রিপ্টোকারেন্সি সংক্রান্ত।
সম্প্রতি পলিমার্কেট আলোচনায় আসে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর। বার্তা সংস্থা এএফপির গত এপ্রিল মাসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্ল্যাটফর্মটিতে ওই ঘটনা নিয়ে বাজি ধরেছিলেন এক মার্কিন সেনা সদস্য। এতে তিনি ৪ লাখ ডলার জেতেন। তবে স্পর্শকাতর গোপন তথ্য নিয়ে বাজি ধরার কারণে পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
- বিষয় :
- ডোনাল্ড ট্রাম্প
- মহিষ
- ক্রিপ্টোকারেন্সি
