ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের পণ্যে আরও ১০% শুল্ক বসাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির অভিযোগ

বাংলাদেশের পণ্যে আরও ১০% শুল্ক বসাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
×

 তাসনিম মহসিন

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৫ | আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ | ০৯:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের পণ্যে আরও ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশসহ মোট ৬০ দেশ। এসব দেশের পণ্যে বাড়তি ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর)। 

শুল্ক আরোপের কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করতে ব্যর্থ হয়েছে এসব দেশ। নতুন শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে মোট শুল্ক সাড়ে ২৬ শতাংশে ঠেকবে। বাংলাদেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে এখন শুল্ক গড়ে সাড়ে ১৬ শতাংশ। 

গত মঙ্গলবার ইউএসটিআরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে ৬০টি দেশের পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ পদক্ষেপ কার্যকর হলে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপানসহ যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ বাণিজ্য অংশীদার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সব দেশকে একই হারে শুল্ক দিতে হবে না। যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্যে পূর্ণ বা আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। যেসব দেশ এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করেনি, তাদের জন্য শুল্কের হার হবে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।

জানতে চাইলে তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সমকালকে বলেন,  বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জবরদস্তিমূলক শ্রমের যে অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে করা হয়েছে, তা একেবারেই সত্য নয়। আমরা বহুবার বলেছি, আমাদের শিল্পে জবরদস্তির শ্রমের কোনো প্রয়োজন নেই। এর কোনো অস্তিত্ব নেই। অন্যদিকে আমদানি উৎসে জবরদস্তি শ্রম থাকার যে কথা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সেটাও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, যে ভিত্তিহীন তা সরকারের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে তুলে ধরা উচিত। বাংলাদেশের পণ্য যুক্তরাস্ট্রের  বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত শুল্ক এখন গড়ে সাড়ে ১৬ শতাংশ।

ইউএসটিআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী– বাংলাদেশ আগে জোরপূর্বক শ্রমের পণ্য আমদানিতে কোনো বাধা না দিলেও সম্প্রতি চুক্তির মাধ্যমে তা সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ কারণে প্রস্তাবিত শাস্তিমূলক শুল্কের হার কিছুটা কম রাখা হয়েছে। 

বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশে জোরপূর্বক শ্রমসংক্রান্ত তদন্ত চালিয়েছে ইউএসটিআর। তদন্তে দেখা গেছে, বাংলাদেশ জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে এবং তা কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই নীতি বা চর্চাকে ‘অযৌক্তিক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

বলা হয়েছে, এই ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করছে এবং উৎপাদকদের একটি অসম প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তবে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে এতে বলা হয়, বাংলাদেশ আইনি নিষেধাজ্ঞা দিতে আগে ব্যর্থ হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ (এআরটি) স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু এআরটি চুক্তির মাধ্যমে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাই তাদের জন্য প্রস্তাবিত অতিরিক্ত শুল্কের হার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। যেসব দেশ এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি, তাদের জন্য এই হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে পোশাক ও বস্ত্র খাতসংক্রান্ত পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বাংলাদেশ চীন থেকে প্রচুর পরিমাণে তুলা আমদানি করে। এই তুলা জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশ এই তুলা ব্যবহারে পোশাক তৈরি করে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এক ধরনের অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। ইউএসটিআরের প্রতিবেদনে চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে সেখানে তুলা এবং পলিসিলিকন জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া অ্যালুমিনিয়াম এবং ইলেকট্রনিকস খাতেও চীনে জোরপূর্বক শ্রমের ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পে ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম এবং শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে এসব দেশে চীন থেকে আসা জোরপূর্বক শ্রমের তুলা ব্যবহার করে কাপড় বা পোশাক তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ইউএসটিআরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাব অনুযায়ী ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় দুই কোটি ৭৬ লাখ মানুষ জোরপূর্বক শ্রমের শিকার। 

 

আরও পড়ুন

×