সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি
বহুমাত্রিক চাপে অর্থনীতি
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি খরচে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে
রাজধানীতে সংবাদ সম্মেলনে মোস্তাফিজুর রহমান ও ফাহমিদা খাতুন - সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৯:১২ | আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬ | ১০:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের অর্থনীতি বহুমাত্রিক চাপের মুখে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি। সামষ্টিক অর্থনীতি, আর্থিক পরিস্থিতি, বিভিন্ন খাত ও সামাজিক চাপ একসঙ্গে তৈরি হয়েছে। অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক নানা ধাক্কা যার কারণ। বর্তমানের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
গতকাল বৃহস্পতিবার ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সিপিডি। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সামনে রেখে চলতি অর্থবছরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সিপিডি বলেছে, শুধু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, বরং দুর্বল সুশাসন, নীতি বাস্তবায়নে ঘাটতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাই মূল চ্যালেঞ্জ। সংস্থাটি মনে করে, বাজার নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংক খাতের স্বচ্ছতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে কার্যকর সংস্কার এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণ এবং দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে হলে প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা জরুরি। শুধু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা যথেষ্ট নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও প্রয়োজন। নীতি বাস্তবায়নে বিশ্বাসযোগ্যতা, জবাবদিহি এবং সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে অর্থনৈতিক নীতির কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। জবাবদিহি ছাড়া যে কোনো নীতিগত সহায়তা সমস্যার সমাধান আরও পিছিয়ে দিতে পারে।
উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলা হয়, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। তবে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বৈদেশিক খাতকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ঝুঁকি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের ঘটনা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করেছে।
সিপিডির মতে, হাওরাঞ্চলের বন্যা এবং হাম রোগের প্রাদুর্ভাব দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। এটি সামগ্রিকভাবে শাসন ব্যবস্থা ও নীতি বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে।
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ওপর চাপ
ফাহমিদা খাতুন বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। গত এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানি, পরিবহন ও সেবা খাতে ব্যয় বৃদ্ধিই মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ। মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক কম হওয়ায় মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
সিপিডির প্রবন্ধে বলা হয়, ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি মার্চ থেকে জুনের মধ্যে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম প্রায় ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পরিবহন খরচ ও নিত্যপণ্যের বাজারে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়েছে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
সিপিডির ঊর্ধ্বতন গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি বলেন, দ্বিতীয় দফায় জ্বালানির দাম বাড়ানো প্রয়োজন ছিল না। কারণ তখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ছিল নিম্নমুখী। তিনি বিপিসির নিজস্ব সক্ষমতার মাধ্যমে চাপ সামাল দেওয়ার কথা বলেন।
বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব
সিপিডি বলেছে, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের একাধিক স্তর থাকায় অনেক পণ্যের খুচরা দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাচ্ছে। কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় এ সমস্যা বেশি প্রকট। সংস্থাটির জরিপে দেখা যায়, উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে কাঁচামরিচের দাম বেড়েছে ১১৬ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, ডালে ৭৮ শতাংশ এবং বেগুনে ৭২ শতাংশ। নগরভিত্তিক আড়তদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্যের কারণে প্রতিযোগিতা কমছে এবং ভোক্তাদের বেশি দাম দিতে হচ্ছে।
রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি
সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী রাজস্ব আহরণে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল প্রবৃদ্ধি চলছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। কর আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১০ দশমিক ৬ শতাংশ, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। সিপিডির মতে, পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শেষ প্রান্তিকে ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। আর বার্ষিক ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শেষ দুই মাসে প্রয়োজন হবে ১২৮ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, যা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব।
বাজেট ব্যয় ও এডিপি বাস্তবায়ন
সিপিডির প্রবন্ধে বলা হয়, মার্চ পর্যন্ত সরকারের মোট বাজেট বাস্তবায়ন হার ৫১ দশমিক ৭০ শতাংশ, যার মধ্যে পরিচালন ব্যয় ৬৩ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩৫.৪ শতাংশ, যেখানে আট বছরের গড় ছিল ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ। পরিচালন ব্যয় বাড়লেও উন্নয়ন ব্যয় কমে যাচ্ছে, যা অর্থনৈতিক ভারসাম্যের জন্য উদ্বেগজনক।
বেসরকারি ঋণ ও বিনিয়োগ স্থবিরতা
সিপিডি বলেছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে রেকর্ড ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বড় বাধা। ব্যাংকে অর্থ থাকলেও তা বিনিয়োগে যাচ্ছে না। এ ছাড়া রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি, যা বেসরকারি খাতে ঋণ কমাতে প্রভাব ফেলছে।
বিনিয়োগ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিনিয়োগে স্থবিরতার পেছনে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কাজ করেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কিছুটা এলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখনও ফেরেনি। তিনি বলেন, নতুন সরকার তিন মাস হলো ক্ষমতায় এসেছে। সরকারকে সময় দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি বাড়ানোর সুপারিশ
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও তদারকি সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সিপিডি। ব্যাংক খাত সংস্কারে কঠোর ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং নীতি বাস্তবায়ন, নিয়ন্ত্রক শিথিলতা ধীরে ধীরে প্রত্যাহার এবং পুনঃতপশিল ও পুনর্গঠিত ঋণসহ প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। সিপিডির প্রবন্ধে বলা হয়, ১৭টি ব্যাংকের ঋণের গুণগত মান যাচাই চলছে। এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় অতিরিক্ত খেলাপি ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে, যা প্রকৃত আর্থিক অবস্থার তুলনায় বড় অমিল।
যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্কের প্রস্তাব
এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ সামনে এনে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের উদ্যোগের পেছনে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ কাজ করছে। তাঁর মতে, শিশুশ্রম নিরসনে সহযোগিতা বা সহায়তা তহবিল গঠনের পরিবর্তে রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা মানবিক উদ্বেগের চেয়ে রাজনৈতিক অর্থনীতির বাস্তবতাকেই বেশি সামনে আনে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র জোরপূর্বক ও শিশুশ্রমের বিষয়টি তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করছে এবং বাংলাদেশের বাস্তবতাকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নিচ্ছে না। রপ্তানির ওপর শুল্ক আরোপ কতটা যৌক্তিক, সেটিই মূল প্রশ্ন।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বের পাল্টা শুল্ক আদালত বাতিল করলেও প্রেসিডেন্টের বিশেষ ক্ষমতায় ১৫০ দিনের জন্য ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়, যার মেয়াদ আগামী জুলাইয়ে শেষ হওয়ার কথা। জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুকে সামনে এনে সেই শুল্ক অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টা থাকতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্কের সঙ্গে চুক্তিতে উল্লিখিত আরও ১৯ শতাংশ যুক্ত হলে মোট হার দাঁড়াবে ৩৪ শতাংশ। অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হলে তা ৪৪ শতাংশে পৌঁছাবে, যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় বড় চাপ তৈরি করবে।
- বিষয় :
- সিপিডি
