ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

অভিমত

আইনের নিজস্ব গতিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে

আইনের নিজস্ব গতিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে
×

ফওজিয়া করিম ফিরোজ

ফওজিয়া করিম ফিরোজ

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ | ১১:৩৭

শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। প্রথম কথা হলো, রায়টা দ্রুত হয়েছে। সরকার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। সরকারের প্রচেষ্টাও ছিল। এ জন্য তারা ওই আদালতে যে প্রসিকিউটর থাকেন, তার জায়গায় আরেকজনকে যুক্ত করেছে।

যতটুকু টেলিভিশন, পত্রপত্রিকায় এসেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, মামলার অনেক বেশি সাক্ষী ছিল না। তা ছাড়া সামাজিক, পারিপার্শ্বিক চাপও ছিল। রায়ে দুজনকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ফাঁসি আমাদের দেশে গ্রহণযোগ্য শাস্তি হলেও অনেক দেশে অনুমোদিত নয়; বিশেষত ইউরোপে। আমাদের দেশে এই আইনে সর্বোচ্চ সাজা হলো মৃত্যুদণ্ড। আমাদের নিম্ন আদালত সেই রায় দিয়েছেন।

এই রায় চূড়ান্ত করার জন্য হাইকোর্টে যাবে। হাইকোর্টেও যেন দ্রুততার সঙ্গে বিচার কাজের বাকি অংশ শেষ হয়, তাই প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী বিশেষ বেঞ্চ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। তার মানে, এ ধরনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এখানেও।

তবে এখনও আমরা জানি না, রায়টা কী ধরনের আলামতের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। ডিএনএ টেস্টের ওপরে দিয়েছে? সব পড়লে বোঝা যাবে, রায়টা কতটুকু টেকসই। আমরা আশা করছি, এটা একটা টেকসই রায় হবে। যার ওপর ভিত্তি করে হাইকোর্টে দোষীদের সাজা বহাল থাকবে।

আমাদের আইনে ছকে ছকে বলা আছে, কতদিনে তদন্ত হবে, কতদিনে চার্জশিট হবে, কতদিনে আলামত সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু এই ছক পালন করা হয় না। আমরা যখন এটা নিয়ে কথা বলেছি, উচ্চতর আদালতে গেছি, তখন বলা হয়েছে, এটা বাধ্যবাধকতা নয়; নির্দেশনা। এখন এই নির্দেশনাকে বাধ্যবাধকতায় এনে এ ধরনের মামলা দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তি করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর জন্য হাইকোর্টের এই বেঞ্চকে স্থায়ী করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান বিচারপতি যদি বলেন, আর অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস ঘেঁটে আরও আগের সব মামলা বের করে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো হাতে নেন, তাহলে আমরা বুঝব– ন্যায়বিচার হচ্ছে। এই বিচার যখন দ্রুত সময়ের মধ্যে দেখা যাবে, তখন মানুষের আস্থা এসে যাবে। যারা এ ধরনের অপরাধপ্রবণতায় ভুগছে, তারাও কিন্তু একটা সতর্কবার্তা পেয়ে যাবে। মাগুরার আলোচিত ধর্ষণ ঘটনার মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামি হিটু শেখের রায় দ্রুত নিষ্পত্তি করতেও এই বেঞ্চকে কাজে লাগাতে হবে।

এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আমাদের নাড়া দেয়। সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়। ভাইরাল হলে চাপ সৃষ্টি হয়। সে কারণে দ্রুত ব্যবস্থাও দেখা গেছে। কিন্তু আমরা কি প্রতিটি ঘটনাতেই ভাইরাল হবো? না। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আর এই নিজস্ব গতিতেই আমাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এটা রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিতে থাকতে হবে। ভাইরাল করে-করে আমরা প্রতিবার বিচার নেব– এটা হতে পারে না।

আমরা শুধু পুলিশের কথাই বলি। হেলথ সার্ভিস প্রভাইডারকেও প্রশিক্ষিত করতে হবে। এসব মামলায় কী করে আলামত জোগাড় করবে? ডিএনএ ল্যাব প্রতিটি জেলায় কীভাবে করা যায়? সরকারের কাছে গণমাধ্যম একটি প্রশ্নের উত্তর চাইতে পারে– ডিএনএ ল্যাবরেটরি করার জন্য বাজেটে টাকা রেখেছে কিনা। 

আরেকটি কথা, ভুক্তভোগীর ছবি ও নাম প্রকাশ না করার বিষয়ে আমাদের দেশে আইন আছে। এই যে মেয়েশিশুটির ছবি প্রকাশ হচ্ছে সবখানে, তা তো হওয়ার কথা নয়। আর গণমাধ্যমের উচিত এমন সামাজিক ইস্যুতে প্রয়োজনে নিজেদের খরচে সচেতনমূলক বার্তা প্রচার করা।

লেখক: সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী

আরও পড়ুন

×