ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

কাবার স্থাপত্যিক সৌন্দর্য এবং পারিপার্শ্বিক অবকাঠামো

কাবার স্থাপত্যিক সৌন্দর্য এবং পারিপার্শ্বিক অবকাঠামো
×

মো. শহীদুল আমিন

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ | ১২:৩৬

কাবা: জ্যামিতির হিসাব ও কিউবের অনন্য বৈশিষ্ট্য
কাবাঘরের কিউব সদৃশ আকার বিস্ময়করভাবে তাওয়াফের পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কাবাঘরের পরিমাপ দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতায় যদি এর দ্বিগুণ হতো তাহলে যেমন তা বিসদৃশ হতো, তেমনই তাওয়াফের কার্যক্রম বিঘ্নিত, বিপর্যস্ত হয়ে পড়তো।

প্রতিটি স্থাপনার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ উচ্চতার মধ্যে আনুপাতিক যে সম্পর্কে সঠিকভাবে, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তা নির্ধারণের মাধ্যমে প্রস্ফুটিত হয় তার সৌন্দর্য। কাবাঘরের নিমার্ণ নির্ধারণে সমুদয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছিলেন হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)। কিউব আকৃতির স্থাপনা এই কাবা নির্মিত হবার রুকু ও সিজদাকারীদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো কাবা। অদ্যাবধি সেই একই আন্তরিকতায় একই ভূমিকায় কাবাঘরের অস্তিত্ব।

হযরত ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক কাবাঘর নির্মাণের সময় যে পরিমাপ নির্ধারিত হলো পরবর্তীকালে তা এক বিস্ময়কর হিসেবের উদ্ভাবন ঘটায়: ১০.৫ মি. × ১০.৫ মি. × ১৫ মি. উচ্চতা। লক্ষণীয় যে, দৈর্ঘ্য বা প্রস্থের তুলনায় উচ্চতা সামান্য বেশি হলেও তা উপসংহারে যে কিউবিক জ্যামিতির আত্মপ্রকাশ ঘটায়, তা অসাধারণ। অথচ তার সূচনা হয়েছিল কয়েকটি অতিসাধারণ জ্যামিতিক বিন্যাসের মাধ্যমেই।
লক্ষণীয়, এই হিসেবের ক্ষেত্রে সামান্য পরিবর্তন ঘটলে নান্দনিক বৈশিষ্ট্যসমূহ ব্যাহত হতো। বিষয়টি নিয়ে একটু চিন্তা করলে বিস্ময়কর মনে হয় যে, হযরত ইব্রাহিম (আ.) কোন জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার ধারণা থেকে কাবাঘরের এমন অবস্থান নির্ধারণ করেছিলেন?

কিউবের ছয়টি দিক ও সর্বব্যাপী উপস্থিতি
প্রসঙ্গত কিউব আকৃতির এরকম জ্যামিতিক স্থাপনা পৃথিবীতে আর কোথাও আছে বলে জানা নেই। কিউবের স্বরূপ অন্বেষণ এক্ষেত্রে গুরুত্ব বহন করে। একটি কিউব সদৃশ আকার ছয়টি সমতল নিয়ে গঠিত। প্রতিটি তল তার পারিপার্শ্বিক জায়গার সাথে এক ধরনের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করে। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যখন একটি গোলকের কথা তুলনা করি। একটি গোলক সেই অর্থে অনুরূপ কোনো সম্পর্ক সৃষ্টি করে না।
কাবাঘরের কিউব আকৃতি সেভাবেই পৃথিবীর সকল দিকের সাথে (অর্থাৎ উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম, ঊর্ধ্ব, অধঃ) প্রতিনিধিত্বমূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। এককভাবে একটি কিউবের সৌন্দর্য তার নির্ভেজাল ও নিখাদ জ্যামিতিক অস্তিতে। স্থাপত্যের ভাষায় 'পিউরিটি' সম্বলিত ধারণা সৃষ্টির মাধ্যমে কিউব এর জ্যামিতিগত অসাধারণত্ব মর্যাদার বিষয়টি নিয়ে বিগত শতাব্দী জুড়ে অনেক গবেষণালব্ধ রচনা প্রকাশিত হয়েছে। সংরক্ষণের অভাবে, ডিজিটাল পদ্ধতির অনুপস্থিতিতে সেগুলির অধিকাংশই আজ অবলুপ্ত অথবা নিখোঁজ হয়ে গেছে।

তাওয়াফ: বৃত্তের কেন্দ্রে ঘনকের মহাজাগতিক রহস্য
বর্গ ও বৃত্ত: দুই জ্যামিতির সমন্বয়
কাবাঘরের এই অবস্থানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হয়ে আছে পবিত্র হজ্জ ও উমরাহ পালনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাওয়াফ। অর্থাৎ কাবাঘরকে কেন্দ্রে রেখে বৃত্তাকারে বারবার ঘূর্ণায়নের মাধ্যমে এখন মুসলমান তার আত্মিক সত্তার আড়ালে লুকায়িত সকল পাপ, কলঙ্ক, কালিমা, দুঃখ-বেদনা-হতাশা থেকে মুক্তি লাভের উপায় হিসেবে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে আত্মসমর্পণ করেন। সে কারণেই তাওয়াফের এই প্রক্রিয়ার কোনো বিকল্প নেই।

তাওয়াফ: চলমান নামাজ
তাওয়াফ হলো চলন্ত নামাজ। স্থিরভাবে নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালাকে খুশি করার জন্য যে চেষ্টা ছিল, তা এখন চলতে চলতে হাঁটতে হাঁটতেও তাঁর প্রশংসা করার ও তাঁকে খুশি করার সুযোগ করে দেয় তাওয়াফ। অগণিত আল্লাহপ্রেমিক একই রকমভাবে মালিকের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য পাগলপ্রায় হয়ে ছুটে চলে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ যেমন যেমন লক্ষ্যে পৌঁছাতে ছুটে যায়, হাজিও তেমনি সব কিছু অতিক্রম করে এগিয়ে যায়। তাওয়াফের স্রোতে সে মহান প্রভুর নির্দেশ পালনের স্বাদ আস্বাদন করেন।
তাওয়াফের ঘূর্ণি আবর্তের মাধ্যমে আত্মসমর্পণকারীর উদ্বেলিত হৃদয়ের সম্পূর্ণ যেভাবে সম্পৃক্ত হলে — তা বিশ্লেষণ করেছেন আর্মস্ট্রং তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে মুহাম্মাদ-এ।

বৈপরীত্যের দৃষ্টান্ত
জেদ্দা হজ টার্মিনাল

প্রসঙ্গক্রমে এখানে স্মরণীয় জেদ্দা বিমান বন্দরের হজ টার্মিনাল স্থাপনা। বেদুইন সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রায় ব্যবহৃত তাঁবুর ধারণা থেকে অনুপ্রেরণাপ্রাপ্ত এই টার্মিনালের আকার, অবয়ব স্থাপত্যশৈলী সম্পূর্ণভাবেই তার স্বকীয় সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে উৎসারিত। আধুনিক বিমানবন্দরের জাঁকজমক, জৌলুস ও বিলাসবহুল অস্তিত্বের সম্পূর্ণ বিপরীতে তার অবস্থান।

মক্কা ক্লক টাওয়ারের অবস্থান
'আবরাজ আস-সাআত' বা 'টাওয়ারস অব দ্য ক্লক' নামে পরিচিত এই বিশাল কমপ্লেক্সের কেন্দ্রস্থিত হোটেল টাওয়ার হলো বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবনের তালিকায় চতুর্থ স্থানাধিকারী– মক্কা ক্লক টাওয়ার। উচ্চতার দিক থেকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ ফ্রি স্ট্যান্ডিং স্ট্রাকচার বিবেচনায় এটি ষষ্ঠতম। পৃথিবীর সর্বোচ্চ ক্লক টাওয়ার হিসেবেও এটি আলোচিত। এই টাওয়ার এবং সংলগ্ন আরও ৭টি ভবনের সমন্বয়ে গঠিত এই কমপ্লেক্স বিশ্বের সর্বোচ্চ দ্বিতীয় ব্যয়বহুল ভবন।
প্রায় ৩৯০ একর স্থান নিয়ে সুনিবিষ্ট এই কমপ্লেক্সের মোট ফ্লোর এলাকা ৩৩ লক্ষ ৪৩ হাজার ৬৮০ বর্গফুট। উচ্চতা ৬০১ মিটার বা ১৯৭২ ফুট। ২০০২ সালে এর নির্মাণকার্য শুরু হয় এবং দীর্ঘ ৯ বছর পরে ২০১১ সালে সমাপ্ত হয়।
এই প্রকল্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও বিস্ময়কর তথ্য হলো — কাবাশরিফ ও মসজিদুল হারাম থেকে এই বিশাল স্থাপনার দূরত্ব মাত্র প্রায় ৩০০ মিটার বা প্রায় ১০০০ হাজার ফুটের নিকটবর্তী।  নৈকট্য কোনো স্থাপনার পবিত্রতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। আর তা যদি হয় ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় কোনো স্থাপনা, তাহলে তা আরও অনেকাংশে বর্ধিত হবে সুনিশ্চিত। কী কারণে এই স্থানে? 

প্রমাণনির্ভর কোনো উপসংহার টানার মতো দাবি এই নিবন্ধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সৌন্দর্যের বিচার বিশ্লেষণে মূলত কোনো সূত্র, কোনো সমীকরণ বা কোনো মাপকাঠি নেই। কী কারণে একটি ফুল সুন্দর, মহিমান্বিত পর্বতমালা, সূর্যাস্তের গোধূলি আকাশ, অপরূপ রমণী অথবা শিল্প উত্তীর্ণ কোনো স্থাপত্য — তার গাণিতিক ব্যাখ্যা পাওয়া দুষ্কর। যে আঙ্গিক ও অবস্থানের সন্নিবেশ ঘটেছে কাবার অবয়বে তা এককথায় অসাধারণ। বিশাল রাতের আকাশ জুড়ে সহস্র নক্ষত্রের মাঝে সুমহিমায় ক্ষুদ্র চাঁদ যেমন তার একক সৌন্দর্যের অস্তিত্ব নিয়ে বিকশিত হয়, কাবাও তেমনি তার নিজস্ব অস্তিত্বের মহিমায় প্রস্ফুটিত হয়ে বিদ্যমান। অতি সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহের সমন্বয়ে অসাধারণ সেই অস্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ।
তথাপি কাবার দুঃখিত হওয়ার কারণও আছে। কয়েক দশক আগেও হেরা গুহা থেকে দিব্যি কাবা সুন্দরমতো দেখা যেত। এখন কাবার চারদিকে সুউচ্চ অট্টালিকা অনেক দূর থেকে কাবা দেখার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। এখন কাবাকে দেখতে হলে অবশ্যই মাতাফে পৌঁছাতে হবে। উন্নয়নের চলমান প্রক্রিয়ায় সে সুযোগও হয়তো নিঃশেষ হবে। বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত কাবার আলো বাতাস আজ একেবারে তার মাথার উপরে সামান্য ছিদ্রের মতো স্থানে সংকুচিত করে আনা হয়েছে। কারণ এখন বড় করে নিঃশ্বাসও নিতে কষ্ট হয়। কাবার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কাবার চোখে পানি। দেখার কেউ নেই।

ড. মো. শহীদুল আমিন: প্রাক্তন অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)

আরও পড়ুন

×