অভিমত
প্রকৃতির যত্ন নিতে হবে
ড. আইনুন নিশাত
ড. আইনুন নিশাত
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ইন্সপায়ারড বাই নেচার, ফর ক্লাইমেট, ফর আওয়ার ফিউচার’। প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমরা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। যে কারণে আমরা বলে থাকি, প্রকৃতি ভালো থাকলে মানুষ ভালো থাকবে, আর মানুষ ভালো থাকলে প্রকৃতি ভালো থাকার কথা, যদি আমরা প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল হই। আমাদের প্রকৃতির যে বিভিন্ন অঙ্গ যেমন– আকাশ, বাতাস, পানি, মাটি বা নদী কিংবা সমুদ্র; সবকিছুর প্রতি আমাদের যত্নশীল হওয়ার কথা। এ ক্ষেত্রে আমাদের সচেতনতা বাড়ানো দরকার। কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়া তথা জলবায়ুতে পরিবর্তন আসছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে আমি বিশেষভাবে বর্ণনা করতে চাই। সেটি হলো আমাদের দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে হাওরাঞ্চলের বন্যা এবং সেখানকার ফসলের ক্ষয়ক্ষতি।
এপ্রিল মাসের শেষের দিকে কিংবা মে মাসে যে বন্যাটি হলো কিংবা যে ফসলহানি হলো, তাতে যেসব কৃষকের ফসলহানি হয়েছে সেটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কারণ তাদের অনেকে সারা বছরের খাদ্য হারিয়েছেন। অনেকে ঋণ নিয়ে বা দাদন নিয়ে ধান চাষ করেছিলেন। তাদের পরিস্থিতি আরও করুণ। বন্যার পর সরকার যেভাবে দ্রুত সাড়া দিয়েছে, ত্রাণ দিয়েছে, সেটা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু কেবল ত্রাণ দিয়ে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাবে না। এ জন্য আমাদের প্রকৃতিকে যত্ন নেওয়া দরকার অর্থাৎ প্রকৃতিকে ঠিকমতো বুঝতে হবে।
মনে রাখতে হবে, যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা, হয়তো তার ১৫-২০ দিন আগে বৃষ্টি হয়েছে। এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য এখন থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ায় অনেক ধরনের অনিশ্চয়তা আসছে। বৃষ্টি স্বাভাবিক সময়ের আগে-পরে হচ্ছে। স্বাভাবিক সময় আমার কাছে মনে হয় হাওরের জন্য এপ্রিলের শেষে। অন্য অংশের জন্য এটা মে মাসের শেষে। অর্থাৎ হাওরাঞ্চলে এপ্রিলের মাঝামাঝি পানির কিছু চাপ আসতে পারে । কাজেই ফসলটা যদি আমি একটু আগে লাগাই, তাহলে এপ্রিলের মাঝামাঝি ধান কেটে নিয়ে যেতে পারি। এতে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আমি লক্ষ্য করেছি ভৈরব, আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু কেন যেন কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেটের কৃষকরা একটু দেরিতে ফসলটা লাগান।
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে– এই ফসল কাটার পরে, শুকানোর বড় জায়গা নেই। সরকার কিংবা বেসরকারি মহল পদক্ষেপ নিতে পারে ধানটাকে খুব দ্রুত শুকিয়ে ফেলার। ড্রায়ারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে কৃষকের জন্য এটা ব্যয়বহুল হতে পারে। কিন্তু এগুলো নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে। যেমন কিছুদূর পর পর টিলার মতো জায়গা তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে ধান শুকানো যেতে পারে। তৃতীয়ত, নতুন নতুন ফসল উদ্ভাবিত হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয় যে ফসল উদ্ভাবন করছে, তাতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, কিছুদিন ডুবে থাকতে পারে সেই ধরনের ধান উদ্ভাবিত হয়েছে। সময় কম লাগবে, এ রকম ধানও আবিষ্কৃত হয়েছে। তার মানে আমরা উপযুক্ত ধরনের নতুন উদ্ভাবিত ফসল লাগাতে পারি। পাশাপাশি, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস সিস্টেমটাকে বদলাতে হবে। কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দিনে দিনে অনিশ্চয়তা অনেক বাড়ছে।
হাওরে যে বাঁধ আছে, সেগুলো বছরের এক সময় কেটে দিতে হয়। যাতে পানি বেরিয়ে যেতে পারে। এই কাজটা সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে করতে হবে। বাঁধ কেটে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে পানি নিষ্কাশিত হতে পারে। বাঁধ মেরামতও সেভাবে করতে হবে, যাতে আগাম বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এই কাজটি পরিচালনার ব্যাপারে অনেক দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। স্থানীয় জনসাধারণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া, বর্তমানে যে পদ্ধতিতে সরকারি কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় তাতে কোনোভাবেই আগাম বন্যাকে ম্যানেজ করা সম্ভব না। প্রতিবছরই আমরা খবরের কাগজে অনেক প্রতিবেদন দেখি। গ্রামের কৃষকরা অভিযোগ করছেন, মার্চ-এপ্রিল মাসে বাঁধ মেরামত না হওয়ায় তারা বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন। আমি মনে করি, এই কাজটির দায়িত্ব স্থানীয় সরকারকে দিতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ উপজেলা পরিষদকে এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিকে এর দায়িত্ব নিতে হবে। সরকারি টেন্ডারের মাধ্যমে এই কাজটি হবে। হাওরের আগাম বন্যা একটা অত্যন্ত জরুরি ইস্যু। এ নিয়ে ভিন্নভাবে ভাবতে হবে। পরিবেশ দিবসে তাই স্মরণ করিয়ে দিলাম।
লেখক: পানিসম্পদ, পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- ড. আইনুন নিশাত
