হাওরের জলে হাজারো কোটি টাকার উন্নয়ন
হাওর, হ্রদ, নদী আর পাহাড়ের অনন্য সৌন্দর্যের একসঙ্গে দেখা মেলে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকায়। ছবির মতো সুন্দর প্রাণ-প্রকৃতি নানা কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে -মহিউদ্দিন আহমেদ
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৮:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
টানা বৃষ্টিতে সোনালি ধানের মাঠগুলো পরিণত হয় অথৈ জলরাশিতে। কোথাও আধাপাকা বোরো ধান পানির নিচে, কোথাও কাটা ধান পচছে পানিতে। আবার বুকসমান পানিতে নেমে এখনও ধান কাটার শেষ চেষ্টা করছেন কৃষক। কীভাবে ঋণ শোধ করবেন, কীভাবে সন্তানদের খাওয়াবেন সেই দুশ্চিন্তা এখন হাওরের ঘরে ঘরে।
কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওর ঘুরে কৃষকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই বিপর্যয়ের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত উন্নয়ন। পরিবেশ ও পানিপ্রবাহের বাস্তবতা উপেক্ষা করে নেওয়া হয়েছে প্রকল্প। দুর্বল সমীক্ষা, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম এবং দুর্নীতিতে ধুঁকছে হাওর। গত এক দশকে হাওর উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, উন্নয়নের চেয়ে ক্ষতিই হয়েছে বেশি।
বাঁধ নির্মাণ হলেও বৃষ্টির পানিতেই তা ভেঙে গেছে। কোথাও কজওয়ে ও সড়ক তৈরি করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে দেওয়া হয়েছে। কোথাও প্রকল্পের নামে হাঁস, গরু, ছাগল বিতরণ করা হলেও স্থানীয় পরিবেশ ও বাস্তবতা বিবেচনায় না নেওয়ায় সেগুলো টেকেনি। কোথাও ডুবন্ত সড়ক বা বাঁধের কথা কাগজে আছে, কিন্তু বাস্তবে তার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। এভাবে কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও হাওরের কৃষক এখনও বন্যার মুখে অসহায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, হাওরের প্রকৃতি না বুঝে সমতল এলাকার প্রকল্প হুবহু এখানে প্রয়োগ করা হয়েছে। ফলে অনেক উদ্যোগ টেকেনি।
২০১২ সালে সিলেট ও বৃহত্তর হাওরাঞ্চলের ৩৭৩টি হাওরকে কেন্দ্র করে সরকার ২০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে। ২০৩২ সাল পর্যন্ত এই পরিকল্পনার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২৮ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। পরিকল্পনায় কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ, জীববৈচিত্র্য, পানি ব্যবস্থাপনা ও জীবনমান উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি ছিল। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ৮০টির বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর আগে শতাধিক প্রকল্প শেষ হয়েছে। কিন্তু কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উন্নয়নের চিত্র কাগজে থাকলেও বাস্তবে তার বড় অংশই অনুপস্থিত।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার শাহপুর গ্রামের কৃষক গোপাল কৃষ্ণ মজুমদার বলেন, ‘অনেক প্রকল্প আইছে, অনেক লোক আইছে, ছবি তুইলা গেছে। কিন্তু আমরা আগের মতোই আছি। সমস্যা হইলে পরে আর কাউরে পাওয়া যায় না।’
গোপাল একটি আয়বর্ধক প্রকল্পের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তাঁর এলাকায় প্রকল্পের আওতায় ছাগল বিতরণ করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই অধিকাংশ ছাগল মারা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কর্মকর্তারা নিয়মিত এলেও পরে আর কেউ খোঁজ নেননি।
হাওরাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পগুলো নিয়ে। প্রতি বছর বর্ষা এলে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। কোথাও কাজ শেষ হওয়ার আগেই বাঁধ ভেঙে যায়, কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়। কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, অনেক স্থানে বাঁধের অস্তিত্বই নেই। কোথাও মাটি ধুয়ে গেছে, কোথাও বাঁধ হাওরের সঙ্গে মিশে গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিবছর একই বাঁধের জন্য নতুন করে বরাদ্দ আসে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয় না।
বাংলাদেশ কৃষক মজুর সংহতির সভাপতি দেওয়ান আবদুর রশিদ নীলু বলেন, হাওরে প্রকল্প মানেই এখন দুর্নীতির উৎস। একই প্রকল্প বারবার করা হয়। যে বাঁধ আগের বছর হওয়ার কথা ছিল, সেটা আবার নতুন নামে আসে। কোথাও বাস্তবে কাজই হয় না। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বরাদ্দ বণ্টন, জনগণের উপকার নয়।
২০১৪ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে শুরু হয় ‘হাওর এলাকায় বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন প্রকল্প’। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ঋণ দেয় প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা।
২৯টি হাওরের উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি ব্যবস্থাপনা ও জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি শেষ হয় ২০২২ সালে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের পর প্রশ্ন উঠেছে এর কার্যকারিতা নিয়ে। প্রকল্পের আওতায় ৮০ কিলোমিটারের বেশি পূর্ণাঙ্গ বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সালের বন্যার পর অনেক বাঁধই ক্ষতিগ্রস্ত বা বিলীন হয়ে যায়। ৩৯৭ কিলোমিটার ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণের তথ্য থাকলেও অনেক স্থানে মানুষ জানেই না কোথায় সেই বাঁধ।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক মানুষ বলেছেন, তারা ডুবন্ত বাঁধ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। অনেকেই বলেছেন, এসব প্রকল্প বাস্তবে মানুষের কাজে আসেনি। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় নির্মিত বহু কজওয়ে কৃষকদের জন্য নতুন দুর্ভোগ তৈরি করেছে। ফসল তোলার মৌসুমে এগুলো দিয়ে যাতায়াত করা যায় না। বরং পানি আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
কিশোরগঞ্জের ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অঞ্চলে নির্মিত ‘অল ওয়েদার রোড’ হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে বিতর্কিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর একটি। ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় এক হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বিশেষ আগ্রহে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। পর্যটকদের কাছে এটি ‘ভাইরাল সড়ক’ হিসেবে পরিচিত হলেও স্থানীয় কৃষকদের কাছে এটি এখন অভিশাপ। কারণ তাদের অভিযোগ, হাওরের বুক চিড়ে নির্মিত এই উঁচু সড়ক পানির স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে দিচ্ছে। এতে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক।
কিশোরগঞ্জের নিকলী সদর উপজেলার ৫নং ওয়ার্ডের কৃষক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আগে পানি আইতো আবার চইলা যাইতো। এখন রাস্তা বাধা হইয়া দাঁড়াইছে। একটু বৃষ্টি আইলেই পানি আটকা পড়ে যায়।’
অষ্টগ্রাম উপজেলার মাদলার হাওরপারের কৃষক সোলায়মান মিয়া বলেন, আমরা রাস্তা চাই, উন্নয়ন চাই। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি আমাদের ধান নষ্ট করে, মাছ মারে, বন্যা বাড়ায়, তাহলে সেই উন্নয়ন আমাদের জন্য না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরের মতো জলাভূমি অঞ্চলে যে কোনো স্থায়ী সড়ক নির্মাণের আগে ব্যাপক পরিবেশগত সমীক্ষা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই সমীক্ষা যথাযথভাবে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার লক হ্যাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান শুরু থেকেই সড়কটির অন্তত ৩০ শতাংশ এলিভেটেড করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ৩০ কিলোমিটার সড়কে পানি চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত সেতু বা কালভার্ট রাখা হয়নি। পুরো সড়কে পানি নামার পথ আছে মাত্র ৯০০ মিটার। ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কেন্দ্রীয় সদস্য আবদুল করিম চৌধুরী কিম বলেন, হাওরে যত্রতত্র সড়ক নির্মাণের ফলে ঘন ঘন বন্যা হচ্ছে। হাওরের পানি বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে প্রবাহিত হয়। সরু সেতু দিয়ে এই পানি দ্রুত নামতে পারে না। দুই দিন পানি আটকে থাকলেও হাজার হাজার একর ফসল নষ্ট হয়ে যায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জে এক লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে আবাদ হয়েছে এক লাখ চার হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমিতে। অল ওয়েদার সড়কের নিচে চলে গেছে প্রায় ১৩১ হেক্টর কৃষিজমি। প্রতি বছর সেখানে প্রায় ১৯ হাজার ৬৫০ মণ ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা ছিল। বাজারদরে যার মূল্য প্রায় ১৯ কোটি টাকার বেশি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের দুই শিক্ষার্থী ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) ২০২২ সালের জুনে প্রকাশিত এক যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশে হাওরের আয়তন ছিল প্রায় তিন হাজার ৩৪ বর্গকিলোমিটার। ২০২০ সালে তা কমে হয়েছে প্রায় ৪০৬ বর্গকিলোমিটার। সে হিসাবে হাওর কমেছে প্রায় ৮৬ দশমিক ৬ শতাংশ। হাওরের বাকি অংশটুকু রক্ষা করতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, গত এক দশকে হাওরাঞ্চলে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম-মিঠামইন অল ওয়েদার সড়ক, সিলেট শহরের পাশের ডুবরির হাওর ভরাট করে উপশহর নির্মাণ, হাওর ভরাট করে জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট গড়ে তোলা, দেখার হাওর ভরাট করে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ এবং জলাশয় ভরাট করে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের বিভিন্ন ভবন নির্মাণের মতো প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।
তিনি বলেন, এসবের পাশাপাশি হাওরাঞ্চলের ভেতর দিয়ে অসংখ্য অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলোই পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। হাওরে যে কোনো উন্নয়ন করতে হলে হাওরের নিজস্ব চরিত্র ও প্রকৃতিকে কেন্দ্র করেই পরিকল্পনা নিতে হবে। অন্য এলাকার উন্নয়ন মডেল এখানে প্রয়োগ করলে তার ফল উল্টো বিপর্যয় হয়ে ফিরে আসে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সমকালকে বলেন, হাওরের মানুষের প্রকৃত উন্নয়ন হয়নি। বরং উন্নয়নের নামে লুটপাট হয়েছে। এসব সমস্যার টেকসই সমাধানে সরকার ইতোমধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ শুরু করেছে। নতুন হাওর ও জলাশয়-সংক্রান্ত আইনের আওতায় কৃষি, মৎস্য, পানিসম্পদ, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পরিকল্পনায় জনগণের অংশগ্রহণ ও স্থানীয় জ্ঞানের সঙ্গে সংযুক্ত করেও বাস্তবায়ন করতে হবে।
- বিষয় :
- হাওর
