সাক্ষাৎকার
হাওর রক্ষায় প্রকৃতির সঙ্গে সমঝোতা জরুরি
কাসমির রেজা
কাসমির রেজা
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৮:০২ | আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৮:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
হাওরাঞ্চল একের পর এক পরিবেশগত ও ব্যবস্থাপনা সংকটের মুখোমুখি। আগাম বন্যা, জলাবদ্ধতা, নদী-খাল ভরাট, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হাওরের মানুষের জীবন-জীবিকাকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে। হাওরের বর্তমান বাস্তবতা, সংকট ও সমাধান নিয়ে সমকাল কথা বলেছে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজার সঙ্গে। এক যুগ ধরে হাওরাঞ্চল নিয়ে কাজ করা এই শিক্ষক ও পরিবেশকর্মী তুলে ধরেছেন মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাহিদুর রহমান
সমকাল: হাওরে প্রায় প্রতিবছর কোনো না কোনো দুর্যোগ দেখা যায়– কখনও আকস্মিক বন্যা, কখনও পাহাড়ি ঢল, কখনও অধিক বৃষ্টি। আপনি এই পুনরাবৃত্ত সংকটকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন?
কাসমির রেজা: হাওরের বাস্তুতন্ত্র অত্যন্ত নাজুক। হাওরের সংবেদনশীলতাকে মাথায় না নিয়ে আমরা হাওরে সমতলের মতো একই ধরনের কার্যক্রম চালাতে চেষ্টা করি। তাই হাওরে প্রতিবছরই কোনো না কোনো দুর্যোগ দেখা দেয়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হলে দেশজুড়ে আলোচনা হয়। এসব দুর্যোগের কারণে হাওরের প্রান্তিক মানুষের জীবনমান ক্রমেই নিম্নমুখী। কৃষির ওপর নির্ভরশীল অনেক বড় বড় গৃহস্থ পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। হাওরে নীরব বাস্তুচ্যুতি হচ্ছে। অনেকেই শহরে পারি জমাচ্ছে। এই মানুষরা শহরে বস্তিতে এসে অতি নিম্নমানের জীবনযাপন করছে। এতে শহরের ওপরও চাপ বাড়ছে। কিন্তু হাওরের এসব সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না।
সমকাল: এ বছরের ফসলহানিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
কাসমির রেজা: এ বছর হাওরে ফসলহানি হয়েছে মূলত জলাবদ্ধতার কারণে। কোথাও কোথাও অকাল বন্যার কারণেও ফসলহানি হয়েছে। হাওরের মানুষ এই ধরনের জলাবদ্ধতা এর আগে দেখেনি।
এ বছর হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ কাটা হবে নাকি বাঁধ রাখা হবে– এ নিয়ে মতদ্বৈধতায় সমস্যা আরও জটিল হয়েছে। কয়েকটি সংঘর্ষও হয়েছে। মধ্যনগরের একটি হাওরের বাঁধ কাটতে গিয়ে এক যুবক মারা যান। সময়মতো বাঁধ কাটতে পারলে কিছু হাওরে ক্ষতির পরিমাণ কমত। বাঁধ নিয়ে এমন বিবাদও এর আগে হয়নি।
সমকাল: হাওরে ফসল রক্ষায় প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয়ে সাবমারর্সিবল ডাইক বা ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ করা হয়। বাস্তবে এসব বাঁধ কতটা কার্যকর?
কাসমির রেজা: ২০১৭ সালের ব্যাপক ফসলহানির পর থেকে বাঁধের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। ২০১৮ সাল থেকে এ বছর পর্যন্ত হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে অন্তত এক হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এ বছর শুধু সুনামগঞ্জ জেলাতেই ৬০২ কিলোমিটারের বাঁধ নির্মাণ হয়েছে। এসব বাঁধ হাওরের প্রকৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উঁচু কান্দা কেটে বাঁধগুলোতে যে মাটি দেওয়া হচ্ছে, সেই মাটি বর্ষায় পানির তোড়ে আবার নদী ও বিলে যাচ্ছে। এতে নদী ও বিলের তলা ভরাট হয়ে নাব্য সংকট বাড়িয়ে তুলেছে। তবে এই মুহূর্তে চাইলেই বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করা যাবে না। এতে ফসলের ক্ষতি আরও বেড়ে যাবে। ভালো বাঁধ হলে বাঁধ পানির প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে নিতে পারে। এতে ফসলের ক্ষতি কম হয়। তবে ধীরে ধীরে আমাদের বাঁধের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে।
সমকাল: স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক বাঁধ নিম্নমানের কাজ, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে টেকসই হয় না। মাঠ পর্যায়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
কাসমির রেজা: এক দশক ধরে প্রতিবছর আমরা পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার পক্ষ থেকে বাঁধ নির্মাণকাজ পরিদর্শন ও মূল্যায়ন করে থাকি। এতে বাঁধে অনেক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ধরা পড়ে। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল এই কর্মসূচি থেকে অর্থ লোপাটের চেষ্টা করে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে অনেক বিলম্ব হয়। গণশুনানির মাধ্যমে সবার উপস্থিতিতে পিআইসি গঠনের কথা থাকলেও সব ক্ষেত্রে তা হয় না। মূলত রাজনৈতিক প্রভাব ও কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে পিআইসিতে অনিয়ম হয়। অবৈধভাবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও পাওয়া যায়। নির্ধারিত সময় ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধের অর্ধেক কাজও শেষ হয় না। শেষে তড়িঘড়ি করে বাঁধ নির্মাণ করতে গিয়ে দুর্বল বাঁধ হয়। এ বছর এপ্রিল মাসেও কয়েকটি বাঁধের কাজ বাকি ছিল।
সমকাল: বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায়– পরিকল্পনায়, বাস্তবায়নে, নাকি তদারকিতে?
কাসমির রেজা: অনেক অপরিকল্পিত বাঁধ হচ্ছে। বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা বা গবেষণা ছাড়া এসব বাঁধ হচ্ছে। এমনও দেখা গেছে, হাওর রক্ষা বাঁধের প্রকল্পের টাকা দিয়ে দুই গ্রামের মধ্যে হাওরের বুক চিরে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো ফসল রক্ষায় কোনো কাজে আসছে না। উল্টো হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। বাঁধ ঠিকমতো কম্পেকশন বা মজবুতকরণ হচ্ছে না। ২ অনুপাত ১ ঢাল বজায় রাখার কথা। তা সব বাঁধে হয় না। ৫০ মিটার দূর থেকে মাটি আনার কথা থাকলেও অনেক বাঁধের গোড়া থেকে মাটি আনা হচ্ছে। এতে বাঁধ দুর্বল হচ্ছে। বাঁধ মনিটরের জন্য জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কমিটি আছে, কিন্তু এসব কমিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।
সমকাল: প্রতিবছর একই ধরনের ক্ষতি হওয়ার পরও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না কেন বলে আপনি মনে করেন?
কাসমির রেজা: স্থায়ী সমাধানের জন্য সমস্যার গোড়ায় যেতে হবে। মূল সমস্যা হলো পানির ধারণক্ষমতা কমে গেছে। হাওরের বিল ও নদীগুলোর নাব্য কমে গেছে। তাই পাহাড়ি ঢলের পানি নদী ছাপিয়ে হাওরে ছড়িয়ে পড়ে। হাওরের ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তন এ জন্য দায়ী। এখন মেঘালয়ের পাহাড়ে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টির কারণে ঢল তীব্র আকার ধারণ করে।
সমকাল: বর্তমানে বাঁধ ব্যবস্থাপনা কি আদৌ হাওরের প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
কাসমির রেজা: বাঁধের এই প্রযুক্তিটা মূলত নেদারল্যান্ডসের প্রযুক্তি। এটি আমাদের হাওরাঞ্চলের প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে ততটা মানানসই নয়। এই বাঁধ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন জরুরি। ২০১৭ সালের আগে মূলত ঠিকাদারদের মাধ্যমে বাঁধ দেওয়া হতো। ২০১৭ সালে বড় ধরনের ফসলহানির পর আমরা সবাই মিলে ঠিকাদারিপ্রথা বাতিলের দাবি জানাই। এরপর কাবিটা নীতিমালা ২০১৮ প্রণীত হয়। এরপর সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা ২০২৩ হয়। ২০১৮ থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে বাঁধ দেওয়ার বহুল প্রচলন শুরু হয়। এখানে স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে পাঁচ থেকে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করে কমিটির মাধ্যমে বাঁধ দেওয়া হয়। এটি একটি ভালো নীতিমালা ছিল। কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে রাজনৈতিক ও পেশিশক্তি বিবেচনায় প্রভাবশালীদের দিয়ে পিআইসি গঠন করা হয়। এই নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে কমিউনিটি ব্যবস্থাপনায় বাঁধ করলে হয়তো আরও ভালো বাঁধ হবে।
সমকাল: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত রাস্তা, কালভার্ট, স্লুইসগেট, বেড়িবাঁধ ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণে হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আপনি কি একমত?
কাসমির রেজা : অতীতে হাওরের স্বাভাবিকতা নষ্ট করে অনেক অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এক ব্যক্তিকে খুশি করার জন্য হাওরের বুক চিরে ২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা করা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে এসব অবকাঠামো হাওরের অনেক ক্ষতি করেছে। এসব অবৈজ্ঞানিক অবকাঠামো হাওরে জলাবদ্ধতা তৈরি করছে।
সমকাল: জলবায়ু পরিবর্তন হাওরের বৃষ্টিপাত, ঢল ও মৌসুমি চরিত্রে কী ধরনের পরিবর্তন এনেছে বলে মনে করেন?
কাসমির রেজা: হাওরে মূলত দুই ধরনের বন্যা হয়। একটি অকাল বন্যা, অন্যটি মৌসুমি বন্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অকাল বন্যার সময়টা এগিয়ে এসেছে। আগে এপ্রিল মাসের শেষে বা মে মাসে অকাল বন্যা হতো। এখন তা হচ্ছে মার্চের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত হয়। অতি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে অধিক বৃষ্টিপাত হয়। এতে পাহাড়ি ঢলে ফসলহানি হচ্ছে। গরম বাতাসে হাওরের ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। ফসলের বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি হচ্ছে।
সমকাল: আপনার মতে, হাওর কি ধীরে ধীরে তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে? হারিয়ে গেলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে?
কাসমির রেজা: জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের প্রকৃতিবিনাশী কর্মকাণ্ডের ফলে হাওর তার স্বাভাবিক প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে একসময় প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে মানুষ হয়তো হাওরে টিকে থাকতে পারবে না। মানবিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এতে শুধু যে হাওরের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা নয়; সমতলের মানুষও খাদ্য ও পুষ্টি সমস্যায় পড়বে। দেশের মোট জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সমকাল: হাওরের জীববৈচিত্র্য, বিশেষ করে দেশীয় মাছ, পাখি ও জলজ উদ্ভিদের ওপর বর্তমান পরিস্থিতির কী প্রভাব পড়ছে?
কাসমির রেজা: হাওরে দেশীয় মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমছে। হাওরের মানুষ এখন বাজার থেকে চাষের পাঙাশ মাছ কিনে খাচ্ছে। টাঙ্গুয়ার হাওরে জীববৈচিত্র্য ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। ধানের উৎপাদন বাড়াতে অধিক হারে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ এর অন্যতম কারণ। এ ছাড়া প্রজনন মৌসুমে অবাধে মাছ শিকার ও অবৈধ জালের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে মাছের উৎপাদন কমছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে অবস্থার আরও অবনতি হবে।
সমকাল: ধান ও মাছ; এই দুই সম্পদের ওপরেই হাওরাঞ্চলের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কৃষক ও জেলেদের অভিযোগ, টেকসই উৎপাদন বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ কম। আপনি কীভাবে দেখছেন?
কাসমির রেজা: জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০০৯ এ শুধু মৎস্যজীবীদের কাছে বিল লিজ দেওয়ার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। মৎস্যজীবীদের নাম দিয়ে পুঁজিপতিরা বিল লিজ নিচ্ছে। তারা বিল সেচ দিয়ে, বিষটোপ দিয়ে মাছ ধরছে। হাওরে অবৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেই। অভয়াশ্রমগুলো আর অভয়াশ্রম থাকছে না। তাই মাছের উৎপাদন কমছে। মোট কথা, হাওরের ওপর ধনিক শ্রেণির লোভ নিয়ন্ত্রণ করে প্রকৃত কৃষক ও জেলেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা না গেলে এসব সমস্যার সমাধান হবে না।
সমকাল: ফসলহানির পর কৃষকরা ঋণের চক্র, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছেন। রাষ্ট্রীয় সহায়তা কি যথেষ্ট?
কাসমির রেজা: রাষ্ট্রীয় সহায়তা যতটুকু করা হচ্ছে তা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কিনা, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক কৃষক বর্গাচাষি। তাদের সহায়তার আওতার বাইরে রাখা হচ্ছে। কিন্তু তারা ক্ষতিগ্রস্ত। হাওরাঞ্চলের ৩৬ জন সংসদ সদস্যের ৩৫ জনই একটি রাজনৈতিক দলের। তাই তালিকা প্রণয়নে রাজনৈতিক প্রভাব পড়ছে কিনা, সেটি দেখাও গুরুত্বপূর্ণ। তালিকাটা করা হচ্ছে তড়িঘড়ি করে। এতেও ভুলভ্রান্তি হওয়ার আশঙ্কা বেশি। তাই সময় নিয়ে, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহায়তা নিয়ে তালিকা প্রণয়ন করা দরকার। বর্গাচাষিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যারা ঋণ করে ফসল ফলিয়েছেন, তাদের ঋণ পুনঃতপশিল এবং কিস্তি স্থগিত করতে হবে।
সরকার তিন মাস খাদ্য ও অর্থ সহায়তা প্রদানের কথা বলেছে। এ সহায়তা আগামী ফসল ওঠার আগ পর্যন্ত দিতে হবে। কৃষকদের বীজ, সার ইত্যাদি ক্ষেত্রেও সহায়তা দিতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত, যারা কোথাও সহযোগিতা চাইতে যাবেন না। তাদের কথাও ভাবতে হবে।
সমকাল: হাওরের কৃষি ব্যবস্থায় কি এখন পরিবর্তন আনা দরকার? যেমন ফসলের সময়সূচি, জাত নির্বাচন বা বিকল্প কৃষি পদ্ধতি?
কাসমির রেজা: হাওরের জন্য স্বল্প জীবনের ও পানিসহনীয় ধান আবিষ্কার করতে হবে। স্বল্প জীবনের ধান চাষ করলে অকাল বন্যায় ফসলহানি অনেক কমে যাবে। আবিষ্কৃত ধানের বীজ কৃষক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। প্রচার করতে হবে। ফলন কম হলে কৃষকরা ব্যবহার করতে চান না।
এ বছর স্বল্পমেয়াদি বীজ ব্রি-৮৮ এর সঙ্গে ব্রি-৯২ জাতের ধানের মিশ্রণ থাকায় কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এমন ভুল হলে নতুন জাতের ধানের প্রতি কৃষকদের আস্থা কমে যাবে। হাওরের জমিগুলো এক ফসলি। এখানে শষ্য বহুমুখীকরণ জরুরি।
সমকাল: হাওর উন্নয়নের নামে বহু প্রকল্প হয়েছে। বাস্তবে স্থানীয় মানুষ কতটা উপকৃত?
কাসমির রেজা: হাওরের প্রতিবেশের সঙ্গে মানানসই নয় এমন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। শত শত কিলোমিটার বাঁধ দিয়ে হাওরকে বড় বড় পুকুর বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। এসব কোনো টেকসই উন্নয়ন নয়। তাই হাওরের মানুষ এতে ততটা উপকৃত হচ্ছে না। স্থানীয় জ্ঞানের সঙ্গে গবেষণালব্ধ জ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে হাওরের উন্নয়ন প্রকল্প নিতে হবে।
সমকাল: আপনার মতে, হাওর ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত কারা? কৃষক, জেলে, নাকি স্থানীয় জনগোষ্ঠী?
কাসমির রেজা: এক শ্রেণির পুঁজিপতি, রাজনীতিবিদ, আমলা মিলে হাওরের বিল থেকে, বাঁধ থেকে, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে, পরিবেশ বিধ্বংসী কাজ থেকে কোটি টাকা লোপাট করছে। গরিব আরও গরিব হচ্ছে। হাওরে আয়বৈষম্য চরম হচ্ছে। তাই কৃষক, জেলে, স্থানীয় জনগোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাই উপেক্ষিত।
সমকাল: সরকার ও নীতিনির্ধারকদের প্রতি আপনার বার্তা কী?
কাসমির রেজা: হাওরের বিস্তৃত জলরাশিতে এক অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। এই সম্পদকে টেকসই ও উৎপাদনশীল ব্যবস্থাপনায় আনতে পারলে এটি দেশের অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। তবে একে শুধু অর্থনীতির দিক থেকে দেখলে হবে না। হাওরকে দেখতে হবে হাওরবাসীর আয়নায়। এর ভূ-প্রকৃতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমিকে মাথায় রাখতে হবে। আমি আশা করি, সরকার হাওরের উন্নয়নে একটি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করবে, যার পরিসর হবে ব্যাপক ও হাওরবান্ধব।
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার
