ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

তীব্র গরমে ক্রেতার খরা, লোকসানের মুখে ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা

তীব্র গরমে ক্রেতার খরা, লোকসানের মুখে ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা
×

টানা তীব্র গরমে বিক্রি কমে গেছে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর পান্থপথ থেকে তোলা সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৯:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

টানা তীব্র গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রাজধানীর জনজীবন। এই অসহ্য উত্তাপের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের ওপর। তীব্র রোদের কারণে রাস্তাঘাটে মানুষের আনাগোনা কমে যাওয়ায় ফুটপাতের দোকানগুলোতে ক্রেতার খরা দেখা দিয়েছে। ফলে অনেকেরই দৈনিক বিক্রি নেমে এসেছে অর্ধেকে। এর ওপর আবার তীব্র গরমে খাবার ও পচনশীল পণ্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কয়েকটি এলাকা ঘুরে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দুপুরের তীব্র রোদে পথচারী ও ক্রেতা না থাকায় কোনো কোনো ব্যবসায়ী দোকান বন্ধ রাখছেন। কেউ কেউ দোকান খুলে রেখে পাশের মার্কেটের ছায়ায় বসে সময় কাটাচ্ছেন। রাজধানীর পান্থপথে বসুন্ধরা সিটির সামনে ভ্যানে করে ডাব বিক্রি করেন মিলন মিয়া। বেচাবিক্রি কেমন জানতে চাইলে কাঁঠালবাগানের এই বাসিন্দা সমকালকে বলেন, ‘রাত জাইগা কারওয়ান বাজার থাইক্যা ডাব আনি। এইহানে আসি সকালে সাড়ে ৭টায় বা ৮টায়। আইস্যা দোকান লাগাই। কিন্তু কাস্টমারের দেখা নাই।’ এখন যে গরম পড়েছে তাতে ডাবের বিক্রি বেশি হওয়ার কথা এমনটা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রোইদ তো বাড়ছেই। মানুষ ডাব বেশি খাওনের কথা। কিন্তু গরমের চোটে অনেকে ঘর থেইকা বাইর হইতে চায় না।’ 

এভাবে গরম পড়তে থাকলে তাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে মন্তব্য করে এই ডাব ব্যবসায়ী বলেন, ‘ব্যবসা কইরা কোনো মতে সংসার চালাই। ব্যবসা না থাকলে মাস শেষে খরচের বোঝা টানা কষ্ট। সরকার আমগো মতো ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের দিকে তাকাইলে আমরা একটু ভালো থাকতে পারি।’   
গরমে খাবার ঢেকে রাখা যায় না, আবার খোলাও রাখা যায় না। এই যন্ত্রণায় ভুগছেন পান্থপথ সিগনালে পুরি, আলুর চপ, শিঙাড়া ইত্যাদি খাদ্যপণ্যের বিক্রেতা সাকিব হাসান। সমকালকে তিনি বলেন, ‘বেচাকেনা একদম কম। রোদ, গরম। মানুষ বাসা-বাড়ি থেকে বাইর হয় না, আগের মতো মনে করেন বেচাকেনা হয় না।’ গরমে তাঁর তৈরি করা খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে এই খাদ্য বিক্রেতা বলেন, ‘ধুলাবালি পড়ে। এ জন্য খাবার ঢাইকা রাখি। কিন্তু মাঝে মধ্যে দেখি, ঢাকনা দেওয়ায় ভেতরে গ্যাস হয়ে গেছে। খাবারটা বেশিক্ষণ টিকে না। মানে নষ্ট হয়ে যায়।’ 
সাকিব হাসান বলেন, ‘খোলামেলার কারণে কাস্টমারদের বসার জায়গায় রোদ পড়ে। এ কারণে কেউ বসতে পারছে না। খাইতে বসলে কাস্টমাররা ঘামাই যান। তাছাড়া গরমের মধ্যে অনেকেই ভাজাপোড়া খাবার খাইতে চায় না। এ কারণে বিক্রি অনেক কমি গেছে।’

আগে সকালবেলায় দোকান খুললেও এখন দুপুরের পর খোলেন মো. শাকিল। রাজধানীর ফার্মগেটে ফুটপাতে জুতার ব্যবসা করেন তিনি। সমকালকে শাকিল বলেন, ‘এখন দোকানই খুলি দুপুরের পরে। মানে দুইটার দিকে। আগে আমরা দোকান খুলতাম সকাল ১০টা, সাড়ে ১০টায়। তাপের কারণে সকালের ব্যবসার চিন্তা এখন বাদ দিছি।’
ব্যবসার ফিরিস্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার লোকসান আছে। যেমন, আগে মনে করেন সকাল বেলা দোকান খুলতাম, রাত্রে বন্ধ করতাম, হাজার বা দেড় হাজার টাকা লাভ হইতো। এখন এক বেলা দোকানদারি করি। বেচাকেনা কম। মোটামুটি আগের তুলনায় অর্ধেক কইমা গেছে। চার-পাঁচশ টাকার বেশি ব্যবসা থাকে না।’ তিনি বলেন, ‘মানুষজন এখন দরকার না হলে বাসা থেকে বের হয় না। কারণ আমরা নিজেরাই রোদের সময় দেখা যায় যে দোকান রাইখা মার্কেটের পাশে ছায়ায় যাইয়া বইসা থাকতে হয়।’

কারওয়ান বাজারের চা বিক্রেতা হোসেন মিয়া বলেন, ‘এই গরমে চা খেতে চাইছে না মানুষ। আগে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কেটলির পর কেটলি চা শেষ হয়ে যেত, এখন মানুষ এসে শুধু ঠান্ডা পানি চায়। চা বিক্রি অর্ধেকের বেশি কমেছে। দুধ-চায়ের জন্য যে দুধ আনি, তাও গরমে কয়েকবার নষ্ট হয়ে যায়। লস দিয়ে কোনো রকমে টিকে আছি।’
এভাবে ব্যবসা কমে যাওয়ায় বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কারণ এই সীমিত আয়ের ওপরই তাদের পুরো পরিবার নির্ভরশীল। ঈদ-পরবর্তী এই সময়ে সাধারণত ব্যবসা কিছুটা কম থাকে। কিন্তু আবহাওয়ার বৈরী আচরণে ব্যবসা হতাশাজনক মন্দা। একদিকে বিক্রি কমে যাওয়া, অন্যদিকে গরমে পণ্য নষ্ট হওয়ার এই দ্বিমুখী লোকসান কাটিয়ে তারা কতদিন ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

আরও পড়ুন

×