ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

২৬ বছরেও মাঠে নেই হাওর অধিদপ্তর

২৬ বছরেও মাঠে নেই হাওর অধিদপ্তর
×

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওর। ফসল রক্ষা বাঁধেও রক্ষা পায়নি কৃষকের স্বপ্নের ফসল জাহিদুর রহমান

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার পান্থপথে পানি ভবনের পেছনে একটি জরাজীর্ণ টিনশেড ভবন। বৃষ্টি হলে ফুটো ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। দেয়ালের পলেস্তারা খসে যাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে ধরেছে ফাটল। এই ভবনেই চলছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের কার্যক্রম। 
এই প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব দেশের প্রায় ৪৩ শতাংশ জলাভূমি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা, নদনদী, খালবিল, বাঁওড় এবং সমুদ্রের ছয় মিটার গভীর পর্যন্ত জলাঞ্চল ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন তদারক করা। প্রতিষ্ঠার ২৬ বছর পরও মাঠ পর্যায়ে কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়ন করতে পারেনি তারা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের জলাভূমি ও হাওর ব্যবস্থাপনায় একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
১৯৭৭ সালে ‘বাংলাদেশ হাওর উন্নয়ন বোর্ড’ গঠিত হয়েছিল। ১৯৮২ সালে তা বিলুপ্ত করা হয়। প্রায় দুই দশক পর ২০০০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড’ পুনর্গঠন করা হয়। পরে ২০১৬ সালের ২৪ জুলাই এটিকে অধিদপ্তরে উন্নীত করা হয়।
দীর্ঘ এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির অর্জন বলতে রয়েছে কয়েকটি সমীক্ষা প্রকল্প। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং সব কটিই ছিল সম্ভাব্যতা যাচাই বা সমীক্ষাভিত্তিক।

বর্তমানে ১০ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে ‘চলনবিল এলাকার পানি ও ভূমিসম্পদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাত্রার মানের সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা’ করছে তারা। এর আগে আড়িয়ল বিল নিয়ে সমীক্ষা করা হয়।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য অন্তত পাঁচটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলো বছরের পর বছর বিভিন্ন দপ্তরে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা মূলত সমীক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই থেকে গেছি। উন্নয়ন কার্যক্রমে যাওয়ার মতো জনবল, বাজেট কিংবা প্রশাসনিক সক্ষমতা কোনো সময়ই তৈরি হয়নি।’
অধিদপ্তরের কার্যক্রমের পরিধি বিশাল হলেও জনবল সীমিত। বর্তমানে অধিদপ্তরে মাত্র ১০ জন কর্মকর্তা আছেন। তাদের সবাই প্রেষণে বিভিন্ন দপ্তর থেকে আসা। কর্মচারী আছেন ১০ জন। অর্থাৎ, দেশের বিস্তীর্ণ জলাভূমি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছে মাত্র ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি প্রতিষ্ঠান।

সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনায় তিনটি আঞ্চলিক কার্যালয় আছে। সেগুলোর অবস্থা আরও করুণ। সুনামগঞ্জ কার্যালয়ে সীমিত আকারে তথ্য ও যোগাযোগভিত্তিক কাজ চলে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, হাওর অধ্যুষিত জেলাটিতে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১০ সালে। এর পর সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে পৌর শহরের ষোলঘর এলাকায় পাউবোর জায়গায় একটি ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। তিনতলা এ ভবন নির্মাণে ব্যয় হয় এক কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়। পাউবো ভবন বুঝে নেওয়ার জন্য হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরকে চিঠি দেয়। কিন্তু ভবনটি বুঝে নেয় চার বছর পর। এর পর ২০১৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উদ্বোধন করেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। এর পর আরও আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও এটির দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম নেই।
সরেজমিন ওই কার্যালয়ে দেখা যায়, সুরমা নদীতীরে নির্মাণ করা তিনতলা ভবনের নিচতলার অর্ধেক ও দোতলায় অফিস এবং তৃতীয় তলায় রয়েছে গেস্ট হাউস। প্রতিষ্ঠানের কোনো কার্যক্রম না থাকায় দোতলার দুটি কক্ষ অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) সিলেটের বিভাগীয় কার্যালয় হিসেবে। আরেকটি কক্ষ ব্যবহার করছে পাউবো। একটি কক্ষে বসছেন হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের এ কার্যালয়ের দুজন কর্মী।
কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ে একজন অফিস সহকারী দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। অনেক সময় অফিস কার্যত অচল অবস্থায় থাকে। এক কর্মকর্তা বলেন, কাজ করার পরিবেশই নেই। আমরা যে দায়িত্ব নিয়ে বসে আছি, তার সঙ্গে বাস্তব সক্ষমতার কোনো মিল নেই।

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, সরকার হাওর নিয়ে পরিকল্পনা করেছে, এটা ইতিবাচক। কিন্তু বাস্তবে হাওরের কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য কিংবা জলবায়ু নিয়ে অধিদপ্তরের কোনো কার্যকর কাজ আমরা দেখিনি। তিনি বলেন, সুনামগঞ্জকে আমরা হাওরের রাজধানী বলি। আমাদের দাবি ছিল, হাওর উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান কার্যালয় এখানে হবে। সেটি না হয়ে আঞ্চলিক কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, কিন্তু এটিরও কোনো সুফল আমরা পাচ্ছি না।
২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর নিজেই দেশের জলাভূমি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। চিঠিতে বলা হয়, দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৩ শতাংশ জলাভূমি। এসব জলাভূমি বর্তমানে ব্যাপক হুমকির মুখে। প্রতিবছর সীমান্তের ওপার থেকে বৃষ্টির পানি ও পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে প্রায় ১০০ কোটি টন সেডিমেন্ট দেশে প্রবেশ করে। এই বিপুল পলির বড় অংশ সমুদ্রে পৌঁছাতে পারে না। ফলে নদনদী, খালবিল, হাওর-বাঁওড়সহ বিভিন্ন জলাভূমি দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। 
অধিদপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আকস্মিক বন্যা, নদীর নাব্য সংকট এবং মরূকরণের ঝুঁকি আরও বাড়বে। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, দেশে বছরে প্রায় ১৪৫ কোটি টন বালু, বালুমাটি ও নুড়িপাথরের চাহিদা রয়েছে। উজান থেকে আসা সেডিমেন্ট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব উন্নয়ন কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে বাস্তবে এসব সুপারিশ কার্যকর করার মতো কোনো প্রকল্প এখনও হাতে নেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ও ক্যাপসের চেয়ারম্যান আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বোর্ড থেকে অধিদপ্তরে উন্নীত হওয়ার ফলে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও টেকসই উন্নয়নে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মুহম্মদ সৈয়দুর রহমান বলেন, হাওর অঞ্চলে এক কোটির বেশি মানুষের বসবাস। কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু অভিযোজন– এসব ক্ষেত্রে এই অধিদপ্তরের কাজ করার বিশাল সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক সক্ষমতার ঘাটতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি কার্যকর হতে পারছে না।
হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সি এম ইউসুফ হোসাইন স্বীকার করেন, মাঠ পর্যায়ে এখনও কাঙ্ক্ষিত কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে জনবল ও অবকাঠামো বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। মহাপরিচালক বলেন, কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, গ্রাম সুরক্ষা, সেডিমেন্ট ব্যবস্থাপনা, বৃক্ষরোপণ, মাছ অবমুক্তকরণ এবং পর্যটন উন্নয়নের মতো কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

আরও পড়ুন

×