ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

লাল লিচু, রঙিন অর্থনীতি

লাল লিচু, রঙিন অর্থনীতি
×

পাবনার ঈশ্বরদীর মানিকনগর গ্রামে আমিরুল সরদারের লিচু বাগান। সম্প্রতি তোলা সমকাল

 সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী (পাবনা)

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৯:০৬ | আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৯:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গাছে গাছে শোভা পাচ্ছে টকটকে লাল লিচু। এসব লিচু পেড়ে এনে বাছাইয়ের জন্য দেওয়া হচ্ছে শ্রমিকদের হাতে। বাছাই শেষে ঝুড়িভর্তি লিচু নেওয়া হয় স্থানীয় হাটে। পাইকাররা এসব লিচু কেনেন। এরপর ট্রাকে করে সরবরাহ করেন রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে। গত দেড় দশকের মধ্যে এবার এ উপজেলায় লিচুর সবচেয়ে ভালো ফলন হয়েছে। এতে বাগান মালিক ও লিচু চাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে। এ উপজেলায় এবার ৭০০ কোটি টাকার লিচু উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।

লিচুর এ ভরা মৌসুমে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরাও। সাহাপুর গ্রামের একটি বাগানে গত মঙ্গলবার দেখা যায় কয়েকজন নারী শ্রমিক লিচু বাছাই করছেন। তাদের একজনের নাম জাহেদা বেগম। তিনি বলেন, সংসারের কাজের বাইরে তিনি এই লিচু বাছাই করেন। এতে তাঁর প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হয়।  

নওদাপাড়া গ্রামে লিচু বাছাইয়ের কাজে যুক্ত হয়েছেন বেশ কয়েকজন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নারী। তাদের একজনের নাম সুমিত্রা। তিনি বলেন, তারা মূলত কৃষিকাজ করেন। প্রতিবছর লিচুর মৌসুমে বাছাইয়ের কাজ করেন। প্রায় এক মাস চলে এই কাজ। এতে বাড়তি আয় হয়। তাঁর ভালোই লাগে। 

উপজেলার সলিমপুর, সাহাপুর, পাকশী, দাশুড়িয়া, মুলাডুলি ও লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় শত শত লিচু বাগান আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাগান রয়েছে সলিমপুর ও সাহাপুর ইউনিয়নে। 
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, চাঁদপুর, পটুয়াখালী, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, কুষ্টিয়াসহ দেশের প্রায় সব অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা লিচু কিনতে ঈশ্বরদীতে আসেন। তারা স্থানীয় হাটগুলো থেকে লিচু কেনেন। এখানে আওতাপাড়া, দাশুড়িয়া, শিমুলতলাসহ বেশ কয়েকটি স্থানে প্রতিদিন বসে লিচুর হাট। শুধু শিমুলতলা লিচু হাটেই প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হয়। আওতাপাড়া হাটে প্রতিদিন ভোর ৪টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চলে লিচু কেনাবেচা। প্রতিদিন এ হাটে পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার লিচু বেচাকেনা হয়। 

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লিচুর মৌসুমে ফজরের নামাজের পর থেকেই লাখ লাখ টসটসে লাল লিচুতে ভরে যায় এসব হাট। একসময় গরুর গাড়ি ও ঘোড়ার গাড়িতে করে ঈশ্বরদী বাজারে লিচু এনে বিক্রি করা হতো। এখন ভ্যান, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইজক, অটোরিকশাসহ নানা যানে করে লিচু আনা হয় হাটে। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা স্থানীয় চাষিদের কাছ থেকে লিচু কেনেন। এর পর ট্রাকে করে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যান। 

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঈশ্বরদীতে লিচু আবাদি কৃষকের সংখ্যা আট হাজার ৫০০ থেকে প্রায় ৯ হাজার। এখানে লিচুর বাগান রয়েছে ১১ হাজার। ফলনযোগ্য লিচু গাছ রয়েছে তিন লাখ ৭২ হাজার। লিচু উৎপাদনের গড় পরিমাণ প্রায় ২৮ হাজার টন।
প্রতিবছর এই উপজেলায় ৪০০ থকে ৫০০ কোটি টাকার লিচু উৎপাদন হয়ে থাকে। তবে এ বছর ফলন অনেক ভালো হয়েছে। তাই ৭০০ কোটি টাকার লিচু উৎপাদন হওয়ার আশা করা হচ্ছে।

কৃষকের কথা
ঈশ্বরদীসহ সারাদেশে লিচু কিতাব নামে পরিচিত লিচুতে জাতীয় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত কৃষক উপজেলার সলিমপুরের চরমিরকামারী গ্রামের লিচু চাষি আব্দুল জলিল কিতাব মণ্ডল বলেন, আশির দশকে ঈশ্বরদীতে লিচুর বাণিজ্যিকীকরণ তাঁর হাত ধরেই শুরু হয়। তখন খুব বেশি টাকা আয় হতো না। তবে, এখন ঈশ্বরদীতে এক মৌসুমেই ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার লিচু বিকিকিনি হয়। 
মানিকনগর গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম সরদার বলেন, শুধু লিচু আবাদ করে গ্রামে গ্রামে শত শত কৃষক এখন স্বাবলম্বী। এলাকায় এখন আর গরিব মানুষ নেই বললেই চলে। 

ব্যবসায়ীদের কথা
শিমুলতলা লিচু হাটের লিচু ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গত ১৫-২০ বছরের মধ্যে ঈশ্বরদীতে এ বছর সবচেয়ে বেশি লিচুর উৎপাদন হয়েছে। প্রচুর সরবরাহ থাকায় দামও তুলনামূলক কম। তাই কৃষক-ব্যবসায়ীরা খুশি। 
আওতাপাড়া হাটের ব্যবসায়ী জামিরুল ইসলাম বলেন, লিচুর ব্যবসা এবার অন্য বছরের তুলনায় ভালো হয়েছে। লাভও হচ্ছে বেশ। ভালো লাগছে।

বাণিজ্যিক আবাদ  
কয়েক দশক আগের কথা। ঈশ্বরদীর সাহাপুর ও সলিমপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে বাড়ির আঙিনায় দু-চারটি করে লিচুর গাছ দেখা যেত। ১৯৮২-৮৩ সালের দিকে কৃষক আব্দুল জলিল কিতাব মণ্ডল প্রথমে তাঁর এক বিঘা জমিতে ১৬টি লিচু গাছ রোপণ করেন। তখন তিনি পাগলামি করছেন বলে কেউ কেউ কথা শোনাতেন। কিন্তু বছর দুয়েক পরে তাঁর বাগানে লিচুর ফলন দেখে এলাকার লোকজনের ধারণা পাল্টে যায়। একে একে অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে লিচুর আবাদ শুরু করেন। এখন কিতাব মণ্ডলেরই ৬০ বিঘা জমিতে সহস্রাধিক লিচু গাছের বিশাল বাগান রয়েছে। প্রতিবছর তিনি লিচু বিক্রি করে আয় করেন ৬০ লাখ থেকে ৭০ লাখ টাকা। 

কর্মসংস্থান
জানা গেছে, লিচু আবাদের পাশাপাশি ঈশ্বরদীতে নারী-পুরুষ লিচু শ্রমিকের সংখ্যা ৬০ থেকে ৭০ হাজার। লিচু প্যাকেট ও খাঁচি করার জন্য বাঁশের খাঁচি, টোপর, ডালি তৈরি, কার্টন, চট,  সেলাই করাসহ নানা কাজে যুক্ত আছেন আরও ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষ। এ ছাড়া পরিবহন ও বিপণনের কাজে যুক্ত হয়েছেন ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ। লিচুর মৌসুমে গ্রামে গ্রামে লিচু বাগানে লিচু বাছাইয়ে যুক্ত হন প্রায় ২০ হাজার নারী। কৃষি বিভাগ, কৃষক ও লিচুর কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত বিভিন্ন সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
 
১৫ বছরের রেকর্ড উৎপাদন
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মমিন বলেন, ঈশ্বরদীর মাটিতে বালু দোআঁশের মিশ্রণ থাকায় এই এলাকায় লিচুর আবাদ ভালো হয়। এ বছর অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ঈশ্বরদীতে লিচুর উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ ভাগ পর্যন্ত বেড়েছে। গত ১৫-২০ বছরের মধ্যে এবার রেকর্ড পরিমাণ লিচুর উৎপাদন হয়েছে। এ বছর শুরুতে পোকার আক্রমণ ও ঝরে পড়ার হারও ছিল খুব কম। ফলে লিচুর আকার বড় হয়েছে এবং স্বাদও ভালো হয়েছে। তবে শেষভাগে গরমের কারণে কিছু গাছের লিচু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পরও ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার লিচু উৎপাদন হতে পারে। 

 

আরও পড়ুন

×