ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

হাওরের গলার কাঁটা বাঁধ

হাওরের গলার কাঁটা বাঁধ
×

সরু ও ভরাট হয়ে যাচ্ছে হাওর অঞ্চলের নদীগুলো। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থেকে তোলা সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

এবার বৈশাখের শুরুতে টানা বৃষ্টির পর সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত তলিয়ে যায়। কৃষকেরা অবাক হয়ে দেখেন, হাওরের পানি বের হওয়ার পথ নেই। কোথাও কৃষকেরা বাঁধ কেটে পানি নামানোর চেষ্টা করেন। কোথাও বাঁধ রক্ষার জন্য আরেক পক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে প্রশাসনকে কিছু এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়। 
এই ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে বছর বছর নির্মিত শত শত কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ। কৃষক, গবেষক, পরিবেশকর্মী এবং কৃষি বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশের মত, হাওরাঞ্চলের বর্তমান জলাবদ্ধতা ও ফসলহানির পেছনে শুধু অতিবৃষ্টি দায়ী নয়; বরং দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত বাঁধ, নদী-খাল-বিল ভরাট, পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনাও বড় কারণ।

তাঁদের অভিযোগ, ২০১৭ সালে হাওরে বিপর্যয়ের পর ফসল রক্ষার নামে যে প্রকল্পভিত্তিক বাঁধ নির্মাণ পদ্ধতি চালু হয়েছে, তা ধীরে ধীরে একটি ব্যয়বহুল কিন্তু অকার্যকর ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। এতে সরকারি অর্থ ব্যয় বাড়লেও হাওরের ঝুঁকি কমেনি।

হাওরের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে
হাওর মূলত একটি প্রাকৃতিক জলাধার। বর্ষা মৌসুমে এটি বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়, আবার শুষ্ক মৌসুমে সেখানে চাষাবাদ হয়। শত শত বছর ধরে এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে হাওরাঞ্চলের জীবন ও অর্থনীতি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওরের মূল শক্তি ছিল এর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ। উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং স্থানীয় বৃষ্টির পানি নদী, খাল, বিল ও প্রাকৃতিক নালার মাধ্যমে দ্রুত ভাটিতে চলে যেত। গত কয়েক দশকে সেই স্বাভাবিক ব্যবস্থা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়েছে।
সুনামগঞ্জের হাওর গবেষক আজিজুর রহমান বলেন, হাওরের প্রতিটি এলাকার সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবে যুক্ত ছিল পানি নিষ্কাশনের পথ। কোথাও ছিল নালা, কোথাও খাল, কোথাও নদীর সঙ্গে সংযোগ। কিন্তু বছরের পর বছর বাঁধ নির্মাণ, ভরাট এবং অবকাঠামো তৈরির ফলে সেই ব্যবস্থা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তিনি বলেন, হাওরের একটি অংশ পানি ধারণ করত, আবার সেই পানি বের হওয়ার পথও ছিল। এখন অনেক জায়গায় সেই সংরক্ষিত এলাকা নেই, নালাও নেই। ফলে পানি আটকে যাচ্ছে।

বাঁধের নিচে আটকে যাচ্ছে পানি
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওর এ সংকটের একটি বড় উদাহরণ। মহাশিং নদীর ওপর আড়াআড়িভাবে নির্মিত উতারিয়া বাঁধের কারণে এবার হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘদিন পানির নিচে ছিল বলে অভিযোগ স্থানীয় কৃষকদের। তাঁরা বলছেন, বৃষ্টির পানি বের হওয়ার সুযোগ না থাকায় হাওরের নিচু অংশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে কৃষকেরা নিজেরাই বাঁধ কেটে নালা তৈরি করে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করেন। পরে প্রশাসনের নির্দেশে সেই অংশ আবার ভরাট করে দেওয়া হয়। 
আস্তমা গ্রামের কৃষক আল আমিন বলেন, ‘আমরা স্লুইস গেট (জলকপাট) চেয়েছি। দেওয়া হয়েছে মাটির বাঁধ। পানি বের হওয়ার রাস্তা না থাকলে ধান বাঁচবে কীভাবে? একই গ্রামের প্রবীণ কৃষক কোয়াজ আলী বলেন, আগে আরও বেশি বৃষ্টি হতো। তখন এত সমস্যা হয়নি। এখন চারদিকে বাঁধ, পানির রাস্তা নেই।’

নদী ও খাল ভরাটের অভিযোগ
কৃষকদের অভিযোগ, প্রতিবছর বাঁধ নির্মাণের জন্য হাওরের কান্দা, ডোবা, নালা ও উঁচু জমির মাটি কেটে নেওয়া হয়। বর্ষায় সেই মাটি ধুয়ে গিয়ে আবার নদী, খাল ও বিলে জমা হয়। ফলে দিন দিন কমছে নদীর গভীরতা। ভরাট হয়ে যাচ্ছে খাল-বিল। কমছে পানি ধারণক্ষমতা।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুকও এ বাস্তবতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, বাঁধের মাটি শেষ পর্যন্ত নদী কিংবা হাওরে গিয়ে পড়ে। এতে নদীর নাব্য কমে এবং খাল-বিল ভরাট হয়ে যায়। ফলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ে।
হাওর গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, আশির দশক থেকেই হাওরের নদী ও জলাভূমি খননের দাবি ছিল। খননের পরিবর্তে বছরের পর বছর মাটির বাঁধ নির্মাণকে সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

হবিগঞ্জেও একই চিত্র
হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলেও কৃষকরা একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন। জেলার বানিয়াচং উপজেলার কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, নদী-খাল ভরাট হয়ে গেছে। পানি নামার কোনো ব্যবস্থা নেই। সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। নয়ন মিয়া নামের আরেক কৃষক বলেন, অফিসে বসে কাগজে হিসাব করা সহজ। কিন্তু মাঠে ফসল ডুবে গেলে ক্ষতি আমাদের।
হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক দীপক কুমার পাল বলেন, দীর্ঘদিন খাল খনন না হওয়ায় পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে এ বছর প্রায় ৩৪০ কোটি টাকার ফসল ক্ষতি হয়েছে।

২০১৭ সালের পর বদলে যায় ব্যবস্থাপনা
২০১৭ সালের ভয়াবহ হাওর বিপর্যয়ের পর ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে সরকার প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) পদ্ধতি চালু করে। উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় কৃষকদের সম্পৃক্ত করা এবং দুর্নীতি কমানো। এই ব্যবস্থায় জেলা প্রশাসককে সভাপতি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে সদস্য সচিব করে জেলা কমিটি গঠন করা হয়। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওদের নেতৃত্বে কমিটি কাজ করে। শুরুতে এটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও পরে নানা অভিযোগ সামনে আসে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পিআইসির অনেক কমিটিতে প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের ঘনিষ্ঠরা স্থান পেয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প নির্বাচনেও স্থানীয় জনগণের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে।

ব্যয় বাড়ছে, প্রকল্পও বাড়ছে
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৬৫টি প্রকল্পে এক হাজার ৩৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। এরপর ব্যয় কিছুটা কমলেও আবার দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এভাবে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ব্যয় হয় ৮০ কোটি টাকা, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ১০২ কোটি, ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ১০১ কোটি, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ৯৫ কোটি, ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ১৫৫ কোটি, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ১০১ কোটি এবং ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ১৩২ কোটি টাকা ব্যয় হয়। চলতি মৌসুমে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪টি হাওরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজও চলছে। সব মিলিয়ে গত আট বছরে শুধু সুনামগঞ্জেই বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে ব্যয় হয়েছে এক হাজার কোটির বেশি টাকা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার চলিত নদীর তীরের কয়েকটি প্রকল্প তদন্তে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে চিহ্নিত হয়। দেখা যায়, এগুলোর সঙ্গে ফসল রক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই। কানলার হাওরের পাশের একটি প্রকল্প স্থানীয়দের কাছে গ্রামীণ রাস্তা হিসেবেই পরিচিত। অথচ সেটি ফসল রক্ষা বাঁধ হিসেবে অনুমোদন পায়। 
দোয়ারাবাজার, জোয়ালভাঙ্গা, দেখার হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের নেতারা বলছেন, প্রকল্প নির্বাচন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে।
পাউবোর টাস্কফোর্সের একাধিক তদন্তে প্রকল্প ব্যয়ে বড় ধরনের অসংগতির তথ্য উঠে এসেছে। একটি প্রকল্পে যেখানে প্রকৃত ব্যয় হওয়ার কথা ছিল প্রায় দুই লাখ টাকা, সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৭ লাখ টাকার বেশি। অন্য কয়েকটি প্রকল্পেও বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি মাটির হিসাব দেখিয়ে অতিরিক্ত বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রকল্প ব্যয়ের সঙ্গে বাস্তব কাজের পরিমাণের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের চেয়ে বরাদ্দ বণ্টনই অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থায় বড় সমস্যা 
এবারের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি নতুন করে একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে–হাওরে পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে পাউবোর আওতাধীন ৫২টি হাওরে ৫০টি রেগুলেটর রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩২টি পুরোপুরি সচল। বাকি ১৮টি আংশিক সচল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে পাহাড়ি ঢল ঠেকানোর কথা মাথায় রেখে। কিন্তু স্থানীয় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। ফলে এপ্রিল ও মে মাসে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সময় অনেক এলাকায় পানি আটকে যায়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম শামসুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার মাটির বাঁধ নির্মাণ কোনো টেকসই সমাধান নয়। তাঁর মতে, প্রতিটি প্রকল্প গ্রহণের আগে বৈজ্ঞানিক সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। কোথায় বাঁধ প্রয়োজন, কোথায় স্লুইসগেট দরকার, কোথায় নদী খনন প্রয়োজন–সেটি নির্ধারণ করতে হবে প্রকৌশল ও পরিবেশগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে।

হাওর গবেষক আজিজুর রহমান বলেন, হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। নদী, খাল ও নালা পুনর্খনন করতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া নতুন বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে হবে।
সুনামগঞ্জ পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি এ কে এম আবু নাছার বলেন, ‘বাঁধ দরকার, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় বাঁধ হাওরের জন্য বিপদ। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো– হাওর রক্ষার নামে আমরা হাওরকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছি কি না।’
সম্পাদনা: আবুল হোসেন


 

আরও পড়ুন

×