ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

পরিবেশ-প্রতিবেশ

উলসীর ‘জিয়া খাল’ পুনঃখননে জনসম্পৃক্ততার দায়

উলসীর ‘জিয়া খাল’ পুনঃখননে জনসম্পৃক্ততার দায়
×

সম্প্রতি শার্শার উলসী খাল পুনঃখনন কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির 

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ | ১২:৫৩

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর আমরা ক্রমবর্ধমান পানিসংকট, খাল-নদী ভরাট, জলাবদ্ধতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাবের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যে ভূখণ্ডের জীবন, জীবিকা ও সভ্যতা একসময় নদী ও খালকেন্দ্রিক ছিল, সেই ভূখণ্ডেই আজ অসংখ্য খাল হারিয়ে গেছে দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে। ফলে খাল পুনরুদ্ধার কিংবা পুনঃখননের যেকোনো উদ্যোগ কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি প্রকৃতি, কৃষি ও মানুষের সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করতে হচ্ছে। 

১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যশোর জেলার শার্শা উপজেলার উলসী খাল কাটা কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন। স্থানীয়ভাবে এ অঞ্চলের মানুষের কাছে খালটি ‘জিয়া খাল’ নামেই পরিচিত । স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ তখন খাদ্য সংকট, সীমিত অবকাঠামো এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। সেই সময়ে জনগণের অংশগ্রহণ ও স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক খাল কাটা কর্মসূচি ছিল একটি গণমুখী উদ্যোগ, যার উদ্দেশ্য ছিল সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, পানি নিষ্কাশনের সুযোগ সৃষ্টি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করা। উলসীর এই খালটি ছিল জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচীর উদ্বোধনী প্রকল্প। সে কারনে  উলসী খাল এক ঐতিহাসিক স্মারক হিসাবে দেখে থাকে সেখানকার মানুষেরা। 

বর্তমানে প্রায় অর্ধশতাব্দী পর এই ঐতিহাসিক উলসী খালের পুনঃখনন কার্যক্রম আবারও শুরু হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল প্রকল্পটির পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেছেন। প্রকল্পটি রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পুনরায় খনন করা হচ্ছে। ১৯৭৬ সালে চার কিলোমিটার দৈর্ঘের খালটি মুলত উলসী- যদুনাথপুর- বেতনা নদী সংযোগের জন্য করা হয়েছিল।  

স্থানীয়ভাবে উলসী ও এর আশপাশের এলাকা ঐতিহাসিকভাবে উষ্ণ ও খরাপ্রবণ হিসাবে দেখা হয়ে থাকে। তবে একই সঙ্গে এটি দেশের অন্যতম উৎপাদনশীল কৃষি অঞ্চল হিসাবেও ধরা হয়ে থাকে। ধান, পাট, শাকসবজি, ফলমূলসহ বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের জন্য এ জনপদ সুপরিচিত। কৃষির সঙ্গে পানির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। উলসী খালটি এ অঞ্চলের জন্য একটি জন গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বলে মনে করেন স্থানীয় মানুষেরা। পাশাপাশি, খাল, বিল ও জলাধারের পুনর্জাগরণ কেবল কৃষির জন্য নয়, সামগ্রিক পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্যও এ খালটির খনন প্রয়োজন ছিল বলে দাবি করছেন  এলাকার মানুষ।      

আমরা সবাই জানি, একটি খাল কেবল পানিপ্রবাহের পথ নয়; এটি একটি জীবন্ত প্রতিবেশ ব্যবস্থা। খালের সঙ্গে যুক্ত থাকে মাছ, উভচর প্রাণী, পাখি, জলজ উদ্ভিদ এবং অসংখ্য অণুজীবের জীবনচক্র। খাল বৃষ্টির পানি ধারণ করে, অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনে সহায়তা করে, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ঘটায় এবং স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। ফলে খাল সংরক্ষণ মানে শুধু কৃষিকে সহায়তা করা নয়; বরং জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতাকেও রক্ষা করা। 
সম্প্রতি প্রকল্প এলাকার একটি অংশ ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে প্রকল্পের তথ্যসম্বলিত একটি বোর্ড মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়, যা নাগরিক তথ্যপ্রাপ্তি ও জবাবদিহির দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগজনক। উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য এ ধরনের তথ্যফলক যথাযথভাবে দৃশ্যমান ও সংরক্ষিত থাকা জরুরি। এটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করার একটি মাধ্যম।

এখানে উল্লেখ্য, খালটির দুই তীরজুড়ে বহু মানুষের বসতি রয়েছে। বাইরে থেকে বোঝা কঠিন, তাঁরা সরকারি জমিতে নাকি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে বসবাস করছেন। তবে মালিকানার প্রশ্নের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা। খালকে যেন কেউ বর্জ্য ফেলার স্থান বা অবৈধ দখলের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার না করে, সে বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। খালের উদ্দেশ্য, ব্যবহারবিধি এবং সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে জনগণকে সম্পৃক্ত না করলে কোনো পুনঃখনন উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী সুফল নাও দিতে পারে। 

একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করাও জরুরি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আশা করা যায়, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটি যথাযথ মান বজায় রেখে সম্পন্ন হবে। কারণ উন্নয়ন প্রকল্পে অব্যবস্থাপনা দেখা দিলে তা কেবল অর্থের অপচয়ই নয়, বরং জনআস্থার সংকটও তৈরি করে। 
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান বাস্তবতা। বাংলাদেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা এবং পানিসংকট সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। এই প্রেক্ষাপটে খাল পুনরুদ্ধার কর্মসূচিকে বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর জলবায়ু অভিযোজন কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। 

প্রকল্প এলাকাটি ঘুরে দেখার সময় একটি বিষয় চোখে পড়ে। খাল পুনঃখননের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি পৃথক ভিত্তিপ্রস্তর ফলক রয়েছে, যেগুলো ভিন্ন ভিন্ন সময়ের ভিত্তি স্থাপন ও উদ্বোধন কার্যক্রমকে নির্দেশ করে। সেই ধারাবাহিকতায় একটি ফলকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং অপর ফলকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নাম উল্লেখ রয়েছে। বিষয়টি প্রকল্পের দীর্ঘ প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রকল্পের পুনরুজ্জীবনের প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। 

আমাদের পূর্বপুরুষরা নদী, খাল ও জলাভূমির সঙ্গে সহাবস্থানের যে সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন, তা আধুনিক সময়ের চাপ ও অব্যবস্থাপনায় ইতিমধ্যে অনেকাংশে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। সেই সম্পর্ক পুনর্গঠন এখন সময়ের প্রয়োজন। উলসীর জিয়া খালের পুনঃখনন সেই দিক থেকে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে, যদি এটি শুধু খননেই সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে যেন একটি টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা মডেলে রূপ নেয়।  কেননা, সময় বদলালেও পানি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা কমেনি; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তা আরও বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।    

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকার কর্মী 
 

আরও পড়ুন

×