যুদ্ধের একশ দিন
টিকে থাকাই ইরানের জন্য বিজয়
মাহজুব জুয়াইরি
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ | ১১:০৪
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার ১০০ দিন পেরিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন। এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও বারবার হামলার কারণে তা লঙ্ঘিত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি এখনও বন্ধ এবং লেবাননে যুদ্ধ অব্যাহত। এই দিক থেকে বলা যায়, শান্তি অধরাই থেকে যাচ্ছে। কারণ উভয় পক্ষের লক্ষ্যমাত্রা অপূর্ণ রয়ে গেছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের লক্ষ্য কেবল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নির্মূল নয়, বরং ইরানের নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামো দুর্বল করে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য সুযোগ তৈরি করা।
তেহরানের মূল লক্ষ্য, যে কোনো মূল্যে শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা এবং তার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। এই অর্থে, ইরান মনে করছে তারা এগিয়ে আছে।
ক্ষতি হয়েছে উভয় পক্ষেরই
এই যুদ্ধে তিন হাজারের বেশি ইরানি নাগরিকের প্রাণ গেছে, যার মধ্যে রয়েছেন রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনের ডজন ডজন শীর্ষ নেতা। এটি স্পষ্ট, ইরান তার নেতৃত্ব, অস্ত্রভান্ডার কিংবা পারমাণবিক কর্মসূচি রক্ষা করতে সক্ষম নয়। সংঘাতের প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ৯০ শতাংশ কমে যায়। কারণ মার্কিন ও ইসরায়েলি অভিযানে উৎক্ষেপণকারী যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের চেয়ে দ্রুত ধ্বংস হয়ে যায়, যা দুই দশক ধরে গড়ে তোলা প্রতিরোধ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করে দেয়।
২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক কর্মসূচিতে আরও হামলা চালানো হয়। বেসামরিক অবকাঠামো ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়। যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই বিপর্যস্ত অর্থনীতি আরও নিচে নেমে গেছে। এদিকে তেহরান যে আঞ্চলিক মিত্র শক্তির জাল বুনেছিল, তা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। মার্কিন বাহিনীর অবস্থান রয়েছে এমন উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে হামলা চালিয়ে ইরান সেই প্রতিবেশীদের আরও দূরে ঠেলে দিয়েছে, যাদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করছিল।
তবে এই যুদ্ধ ইরানের প্রতিপক্ষের জন্যও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি বয়ে এনেছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঞ্চলিক একাধিক মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে, যা মার্কিন সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে দিয়েছে। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে এমন একটি সংঘাতে টেনে নামানো হয়েছে, যা তারা চায়নি এবং নিজেদের ভূখণ্ডেই আক্রান্ত। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের সমন্বয়ের ভিত্তিতে থাকা নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি আগের চেয়ে কম নির্ভরযোগ্য মনে হচ্ছে। তাই এ যুদ্ধের সবচেয়ে স্থায়ী প্রভাব হয়তো ইরানের সক্ষমতার ক্ষতি নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেটি।
সামরিক দুর্বলতা থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরুর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করতে শুরু করে, যে পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। মার্চ মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই জলপথ পুনরায় খুলতে বিমান অভিযান পরিচালনা করে এবং এপ্রিলে ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ জারি করে। এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রণালি বন্ধ রয়েছে। ইরানের যাচাই করা মাত্র কয়েকটি জাহাজ পার হওয়ার অনুমতি পেয়েছে।
সামরিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ওয়াশিংটন যখন ন্যাটো এবং ইউরোপ ও এশিয়ার অংশীদারদের কাছে এই পথ নিরাপদ করতে সহায়তা চেয়েছিল, তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। ইউরোপীয় সরকারগুলো এই সংঘাতকে তাদের এখতিয়ারের বাইরে বলে চিহ্নিত করেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখাকে ইরান কেবল অর্থনৈতিক সুবিধা হিসেবেই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরাজয় হিসেবেও ব্যাখ্যা করছে। সাহস দেখিয়ে ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আত্মসমর্পণের পরিবর্তে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। জাতিসংঘসহ রাশিয়া ও চীনের চলমান সমর্থনে তেহরান এই যুদ্ধকে একটি বিচ্ছিন্ন সংঘাত হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর আধিপত্যের বৃহত্তর প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
সামনে কী
যুদ্ধে নিজস্ব হিসাবনিকাশ অনুসারে নিজেকে ভালো অবস্থানে বিবেচনা করছে ইরান। তার নেতৃত্বের দৃষ্টিতে শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখাটাই গুরুত্বপূর্ণ। যতক্ষণ ইসলামী প্রজাতন্ত্র টিকে থাকবে ততক্ষণ অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি পুনরুদ্ধারযোগ্য। ইরান এই সাফল্যকে আঞ্চলিক অবস্থানের আংশিক পুনরুদ্ধারে রূপান্তরিত করতে চাইছে বলে মনে হচ্ছে। সংঘাতের যে কোনো মীমাংসা লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের সঙ্গে সংযুক্ত করে ইরান নিজেকে আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, যে নেতৃত্ব শাসনব্যবস্থার টিকে থাকাকেই বিজয় মনে করে, তারা কি একটি স্থায়ী শান্তি অর্জন করতে পারবে? নাকি তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে যে কেবল আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান এবং সম্ভাব্যভাবে একটি পারমাণবিক অস্ত্র তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে? আগামী ১০০ দিন হয়তো এর উত্তর দেবে।
মাহজুব জুয়াইরি: ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিশ্লেষক; আলজাজিরা থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক
- বিষয় :
- ইরানে হামলা
- যুক্তরাষ্ট্র
- ইসরায়েল
