অর্থনীতি
শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংকই অর্থনীতির ভরসা
মামুন রশীদ
মামুন রশীদ
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ | ১১:০৯
একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক মানে শুধু নোট ছাপানোর ক্ষমতা নয়। এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতার প্রধান রক্ষক। একটি কার্যকর কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, বাজারে আস্থা সৃষ্টি করে এবং সংকটের সময় অর্থনীতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও শক্তিশালী, স্বাধীন এবং পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সময়ের দাবি। এ জন্য প্রয়োজন নীতিগত স্বাধীনতা, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি এবং কার্যকর জবাবদিহি। এ জন্য মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। আইনি কাঠামোয় স্বাধীনতা থাকলেও বাস্তবে সেই স্বাধীনতা এখনও সীমিত। প্রায়ই দেখা যায়, সরকারের রাজস্ব চাহিদা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বাজারে তারল্য চাপ সৃষ্টি করে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে। এই বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে ঘনিষ্ঠ নীতি-সমন্বয় অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে ‘সহযোগিতায় স্বাধীন’, কোনোভাবেই অধীনস্থ নয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। একটি রাজস্ব ও ব্যয়ের নীতি পরিচালনা করে; অন্যটি নিয়ন্ত্রণ করে মুদ্রা সরবরাহ, সুদের হার ও আর্থিক স্থিতিশীলতা। এ দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে অর্থনীতিতে নীতিগত অসংগতি সৃষ্টি হয়। আবার অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা, তথ্য বিনিময় এবং নিয়মিত নীতি-সংলাপ।
একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভিত্তি হলো তার মানবসম্পদ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা নয়, বরং উন্নত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক বাজার, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম এবং গবেষণামূলক কাজের সুযোগ সৃষ্টি করাও জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি শক্তিশালী নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ সক্ষমতা ছাড়া কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যকরভাবে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারে না। দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরেই একটি শক্তিশালী ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে অর্থনীতিবিদ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং ঝুঁকি বিশ্লেষকরা যৌথভাবে কাজ করবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদটি দেশের আর্থিক নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। অথচ অতীতে এই নিয়োগে পেশাগত যোগ্যতার পাশাপাশি অন্যান্য বিবেচনাও প্রাধান্য পেয়েছে। একটি আধুনিক ও কার্যকর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য গভর্নর নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও যোগ্যতাভিত্তিক করতে হবে। অনেক দেশেই স্বাধীন অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানকে নির্বাচন করা হয়। বাংলাদেশেও এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে গভর্নরের মেয়াদ, পুনর্নিয়োগ এবং অপসারণের শর্তাবলি স্পষ্টভাবে আইনে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে তিনি রাজনৈতিক চাপমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিয়েল-টাইম ডেটা অ্যানালিটিক্স, ডিজিটাল কারেন্সি এবং সাইবার নিরাপত্তা এখন তাদের মূল অগ্রাধিকার। বাংলাদেশ ব্যাংকও সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি (সিবিডিসি) এবং ডিজিটাল তদারকি বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। তবে এসব উদ্যোগ সফল করতে হলে দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি অবকাঠামো এবং শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

মুদ্রানীতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে রয়েছে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চাপ। শুধু সুদের হার পরিবর্তনের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়। সুদহার, বিনিময় হার এবং ঋণপ্রবাহ– এই তিনটি ক্ষেত্রকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং বাজারের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
ব্যাংক তদারকি ও আর্থিক সুশাসনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঋণখেলাপি সংস্কৃতি, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদারকির অভাব ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। রিস্ক-বেজড সুপারভিশন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং আইন প্রয়োগে সমতা নিশ্চিত করা না গেলে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। ভারত মুদ্রানীতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করেছে মনিটারি পলিসি কমিটির মাধ্যমে। মালয়েশিয়া আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ম্যাক্রো-প্রুডেনশিয়াল নীতি শক্তিশালী করেছে। ইন্দোনেশিয়া প্রযুক্তিনির্ভর তদারক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। আর ভিয়েতনাম ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের দেখায় যে সফল সংস্কারের মূল ভিত্তি হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা, ধারাবাহিকতা এবং পেশাদার নেতৃত্ব। বাংলাদেশও সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
আগামী দশকে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত তিনটি ক্ষেত্রে– মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার নিরাপদ বিকাশ এবং আর্থিক সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা। অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দূরদৃষ্টি, পেশাদার নেতৃত্ব এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার ওপর। একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু আর্থিক খাতকেই শক্তিশালী করে না, এটি বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়ায়, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করে এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে দেয়। বাংলাদেশও যদি সেই পথে এগোতে চায়, তবে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি আধুনিক, স্বাধীন এবং পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার বিকল্প নেই। কারণ শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির শক্তি অনেকাংশেই নির্ভর করে তার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শক্তির ওপর।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক
- বিষয় :
- অর্থনীতি
