ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

শিশু ধর্ষণ ও হত্যা

দ্রুত রায় আশা দিলেও আস্থা দিচ্ছে কি?

দ্রুত রায় আশা দিলেও আস্থা দিচ্ছে কি?
×

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ | ১১:০৬

বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে অন্যতম নজির স্থাপিত হলো রোববার এক দম্পতির ফাঁসির আদেশের মধ্য দিয়ে। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার অপরাধের মামলায় সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে শেষ হলো মামলার বিচারিক কার্যক্রম। এতে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার গায়ে যে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ লেপ্টে আছে, সেখানে ব্যতিক্রমী উদাহরণ হলো। এখন সংশয় দেখা দিয়েছে রায় কার্যকর হওয়া নিয়ে। এ রায় কার্যকর বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

হাইকোর্টের অনুমোদনপ্রাপ্তি, আপিল বিভাগের প্রক্রিয়া, রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন, সবশেষ রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা– এই চার ধাপ অতিক্রমের পর কার্যকর হয় ফাঁসির আদেশ। তবে বলার অপেক্ষা থাকে না, এসব প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এ দেশে হরহামেশাই পরমায়ু পেয়ে থাকেন। বর্তমানে কনডেম সেলে থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামির সংখ্যা থেকেও এ অকপট সত্য আন্দাজ করা যায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, গত বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দেশের ৬৮টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারের সেলগুলোতে ২ হাজার ৭০৫ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বন্দি ছিলেন এবং সংখ্যাটি কারা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তাই শুধু দ্রুত রায় প্রাপ্তিতে আস্থা রাখা কঠিন। 

মিরপুরের পল্লবীর ৮ বছরের শিশুটি ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় গত ১৯ মে। এ মামলায় রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষ হয় গত বৃহস্পতিবার। যুক্তিতর্ক শেষে আদালতে ৭ জুন রায় ঘোষিত হলো। তবু মানুষের এই আস্থাহীনতার কারণ ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড অনুযায়ী তা কার্যকর না হওয়ার পরিসংখ্যান। 

মাগুরায় ৮ বছরের শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়ও দ্রুততম সময়ে হয়ে নজির তৈরি করেছিল।  শিশুটি বোনের শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় ২০২৫ সালের ৬ মার্চ। সে ঘটনার পর আরও ছয় দিন বেঁচে ছিল সে। ছুটির দিন বাদে টানা শুনানি করে দুই সপ্তাহের কম কার্যদিবসে শেষ হয়েছিল সে মামলার বিচার। মামলার মূল আসামি শিশুর বোনের শ্বশুর হিটু শেখ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন। ২০২৫ সালের ১৭ মে রায়ে তাঁর ফাঁসির আদেশের পর অতিক্রান্ত হয়েছে এক বছর দুই সপ্তাহ। হিটু শেখ এখনও পৃথিবীর আলো-হাওয়া উপভোগের সুযোগ পাচ্ছেন। দেশজুড়ে আলোচিত এমন রোমহর্ষক মামলার রায় কার্যকর হতেও যখন বছর পেরিয়ে যায় তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের বিশ্বাস ভেঙে পড়ে। 

বহুল আলোচিত মামলার হাল যদি এ-ই হয়; কম আলোচিত ঘটনাগুলোর জায়গা হয় শুধু বিস্মৃতির তালিকায়। যেমন বিচার না পেয়ে ২০১৭ সালের ২৯ এপ্রিল গাজীপুরের শ্রীপুরে ৮ বছরের পালিত মেয়ে আয়েশাকে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন দিনমজুর হজরত আলী। তাঁর শিশুকন্যাকে ধর্ষণ করেছিল স্থানীয় এক প্রভাবশালী বখাটে। অসহায় পিতা বিচার চেয়ে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে ব্যর্থ হয়ে উপরন্তু নিজেই লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলেন। এসব ঘটনাই মানুষকে আরও আস্থাহীন করেছে আইনের প্রতি। 

তবে এবার পল্লবীতে প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ানো ৮ বছরের শিশুটির খণ্ডিত মরদেহ আর হত্যার আগে পৈশাচিক নির্যাতনের বর্ণনা যেন বুকের ভেতর দাগ কেটে দেয়। ঘটনাটি রাজধানীতে ঘটায় এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে যাওয়ায় দেশের সবাই জেনেছেন। মানুষ ফুঁসে উঠেছেন; এমনকি আসামিকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়েও নিতে চেয়েছিলেন। 

এ মামলায় যে দ্রুত বিচার হবে এবং বিচারে যে প্রধান আসামি সোহেল রানার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হবে– সেটি মোটামুটি অনুমিত ছিল। যদিও বিচারককে রায় দিতে হয় মামলার অভিযোগপত্র এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে। জনগণের মতামতের ওপর বিচারের রায় নির্ভর করে না। কিন্তু এও তো ঠিক, কোনো একটি ঘটনা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলে; সমাজ ও রাষ্ট্রে তোলপাড় শুরু হলে, সেটি নিয়ে একটি অলিখিত চাপ বিচারকের থাকেই। সেখানে যদি রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট হয়, তখন বিচারককে তা নিয়েও ভাবতে হয়। কিন্তু রায় ঘোষণা এবং তা কার্যকরের ভেতর যে বাংলাদেশে সাত সমুদ্র তের নদী-সমান ব্যবধান– সে প্রমাণ হিটু শেখের মতো আসামির ঘটনা। তাই সোহেল রানা আর স্বপ্না আক্তারের মতো নৃশংস খুনির ক্ষেত্রেও মানুষ সে আশঙ্কা করেন। তবুও কথা থেকে যায় সুশাসনের জন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে। ফাঁসির আসামিরও আপিলের সুযোগ, প্রাণভিক্ষা চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেসবের একটি লঙ্ঘিত হলেও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে একদিন প্রশ্ন উঠবে। সে বিষয়েও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।  

এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল প্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তি বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে রোববার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী। আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় আগামী তিন মাসের মধ্যে ‘কার্যকর করা সম্ভব’ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। 

আমাদের কথা হচ্ছে, কোনো প্রকার সামাজিক চাপে নয়; আইন নিজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখুক স্বচ্ছতা নিয়ে। দ্রুত বিচার মানে শুধু শাস্তি নিশ্চিত করা নয়; বরং ভুক্তভোগী পরিবারকে অনিশ্চয়তার দীর্ঘ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়া এবং সমাজে আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া। যেহেতু আসামি নিজেই নৃশংসতার বর্ণনা দিয়েছেন; যত দ্রুত সম্ভব রায় কার্যকর হোক। যেন এই রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে বার্তা পৌঁছে যায় সম্ভাব্য ধর্ষণকারীর কাছে। যেন এই রায় কার্যকর আরও একটু নিরাপদ করে তোলে আমাদের সকল কন্যা-জায়া-জননীর অবস্থান।

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×