বিরোধী আসনে তদারকি
গণতান্ত্রিক উদারতা কাম্য
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ | ১১:১০
জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের আসনে উন্নয়ন তদারকি এবং রাজনৈতিক সমন্বয়ের দায়িত্ব বিএনপির সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিদের দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অগ্রহণযোগ্য। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনমতে, শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদীয় দলের সভায় বিএনপির ৩৬ নারী এমপিকে বিরোধী দলের ৭৯টি আসনের দায়িত্ব বণ্টন করিয়া দেওয়া হয়। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলও সরকারের অংশ– এই চিরাচরিত রীতি উপেক্ষিত।
বিরোধীদলীয় সংসদীয় আসনে সংরক্ষিত আসনের সরকারদলীয় এমপিকে খরবদারি চালানোর সুযোগদানের এহেন সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রের কোনো নীতিতেও গ্রহণীয় নহে। এমন আশঙ্কা অমূলক নহে, সরকারি দলের এই একতরফা পদক্ষেপের কারণে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি বৈ হ্রাস পাইবে না। কারণ এই ব্যবস্থায় বিরোধী সংসদ সদস্যগণ একদিকে স্থানীয় ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণে অক্ষম হইয়া জমি হারানোর আশঙ্কায় ভুগিবেন, অন্যদিকে সেই জমি পুনরুদ্ধার চেষ্টায় তাহারা মরিয়া হইয়া উঠিতে পারেন। উহার অনিবার্য ফলস্বরূপ একই আসনের দুই এমপির অনুসারীদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ বাধিতে পারে।
স্মরণ করা যাইতে পারে, অতীতের রীতি-নীতি লঙ্ঘনপূর্বক নবম সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মতো বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াত, এলডিপি এবং বিজেপির ৩৪টি আসনে ‘উন্নয়নের’ দায়িত্ব সংরক্ষিত আসনের আওয়ামী লীগের নারী এমপিদের দিয়াছিলেন। ইহার ফলে তৎকালীন সরকারবিরোধী এমপিগণ স্বীয় এলাকায় কোণঠাসা হইয়া পড়েন। নাগরিক সমাজ উক্ত পদক্ষেপকে কখনোই হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করে নাই। দুর্ভাগ্যবশত, আওয়ামী লীগের ঐরূপ পদক্ষেপের কট্টর সমালোচক বিএনপিও ক্ষমতাসীন হইয়া সংসদ ও উন্নয়নমূলক কার্য পরিচালনায় আওয়ামী লীগের ব্যর্থ
পথেই হাঁটিতেছে।
সিদ্ধান্তটি যে অনেকাংশে স্ববিরোধী, তাহাও বলা প্রয়োজন। যেমন, সংসদে রুমিন ফারহানার সহিত আরও ছয়জন স্বতন্ত্র এমপি রহিয়াছেন, যাহাদের প্রায় সকলে বিএনপি হইতে হয় অব্যাহতি লইয়াছেন, নহে তো দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষ করিয়া নির্বাচন করিবার দায়ে বহিষ্কৃত। কিন্তু রুমিন ফারহানার আসনে সংরক্ষিত এমপিকে দায়িত্ব প্রদান করা হইলেও অন্য ছয় আসনে তাহা দেওয়া হয় নাই। বিষয়টি সন্দেহজনকও বটে; কারণ সংশ্লিষ্ট আসনের জনগণ বিএনপি প্রার্থীর পরিবর্তে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভোট দিবার অর্থ দলীয় আনুগত্যমুক্ত হইয়া তাহারা সরকারের জনস্বার্থবিরোধী পদক্ষেপের বিরোধিতা করিবেন। কিন্তু বাস্তবে উহারা বিএনপিকে সমর্থন করেন বলিয়াই সংরক্ষিত আসনের এমপির খবরদারি হইতে তাহাদের মুক্ত রাখা হইয়াছে।
আরেকটি গুরুতর বিষয় হইল, কোনো নারী এমপিকে একটি আসনের, কয়েকজনকে দুইটির এবং সর্বোচ্চ চারটি আসনের দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছে। এমনকি কয়েকজনকে সমগ্র জেলারই দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছে, যেইখানে সকল এমপিই বিরোধী পক্ষভুক্ত। এই অতিরিক্ত ভার বহিতে গিয়া সংশ্লিষ্ট নারী এমপিগণ যে খাবি খাইতে পারেন, উহা বুঝিতে বিশেষজ্ঞ হইবার প্রয়োজন নাই। তবে এহেন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট আসনগুলির জনগণও যে বঞ্চিত থাকিবেন, তাহা বলা যায়। এদিকে বিগত সময়ের ভ্রান্তি ও বৈষম্যমূলক উন্নয়ননীতির কারণে দেশে সুষম উন্নয়ন ছিল সোনার হরিণ; বিশেষত উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলি পশ্চাতে রহিয়াছে। উল্লেখ্য, আলোচ্য আসনগুলির বেশ কয়েকটি ঐ উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলভুক্ত। অর্থাৎ উক্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে এই আসনগুলির উন্নয়নবঞ্চনা শুধু দীর্ঘস্থায়ী নহে, দ্বিগুণ হইতে যাইতেছে।
দেশে যখন সংসদীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালীকরণের জোর তাগিদ সৃষ্টি হইয়াছে, তখন বিরোধী পক্ষভুক্ত বলিয়া নির্বাচিত এমপিগণকে কার্য করিতে না দেওয়ার অপসংস্কৃতি আদৌ কাম্য নহে। আমাদের প্রত্যাশা, জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনপূর্বক সরকার উক্ত সিদ্ধান্ত দ্রুত পুনর্বিবেচনা করিবে।
- বিষয় :
- সংসদে বিরোধীদল
