ছায়া বাজেট
কর ছাড় কমিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির প্রস্তাব জামায়াতের
বাজেট ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬ | ২১:৩৪ | আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬ | ২১:৩৫
কর ছাড় কমিয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির প্রস্তাবসহ ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার ছায়া বাজেট ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে এতে। অটোমেশন ও করজাল বৃদ্ধিতে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বরকে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরে (টিআইএন) রূপান্তরের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা দিলেও, করপোরেট ট্যাক্স কমানো এবং করযোগ্য আয়সীমা বৃদ্ধি করে সাড়ে চার লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে জামায়াতের ছায়া বাজেটে।
মঙ্গলবার রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে ‘জনমুখী বাজেট প্রস্তাবনা ২০২৬-২৭’ নামে এই ছায়া বাজেট তুলে ধরেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। এতে উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৫১ কোটি টাকা। পরিচালন ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। ঘাটতি জিডিপির ২ দশমিক ৫১ শতাংশ তথা ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা।
ছায়া বাজেটে বলা হয়েছে, জ্বালানির দামের আকস্মিক পরিবর্তনে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় হ্রাস, কর হার যৌক্তিকীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্পখাতে পরিষেবার দাম স্থিতিশীল রাখার মাধ্যমে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রস্তাবনা রয়েছে জামায়াতের ছায়া বাজেটে।
এতে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারে অনাস্থার কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বাজার থেকে টাকা সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলে ঋণের মূল উৎস হয়ে গেছে ব্যাংক ঋণ, যা ব্যাংক খাতের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ছায়া বাজেটে শেয়ারবাজারের সুশাসন নিশ্চিত করা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা শক্তিশালী করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
জামায়াত বলছে, বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৭, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় কম। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ধাপে ধাপে ১৪ শতাংশে উন্নীত করতে দলটি কর ফাঁকি রোধ এবং করজাল সম্প্রসারণে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের এনআইডিকে টিআইএন নম্বরে রূপান্তর করার প্রস্তাব করেছে। এতে করযোগ্য আয় না থাকলেও প্রত্যেক ব্যক্তিকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। যাতে করযোগ্য কোনো ব্যক্তি করের আওতার বাইরে না থাকতে পারেন, তা নিশ্চিত হবে। বর্তমানে ৪০ লাখ নাগরিক রিটার্ন দাখিল করেন। এই সংখ্যাকে পৌনে ১৩ কোটিতে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াত।
ভ্যাট আয় বৃদ্ধিতে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন ও সকল পণ্যের বিক্রয় রেকর্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনবিআরের সার্ভারে রেকর্ডিংয়ের জন্য কম্পিউটারাইজড সিস্টেম চালুর প্রস্তাব করেছে জামায়াত। দলটির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সরকারের কর আয়ের চেয়ে কর অব্যাহতি বা ছাড় বেশি। ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকার প্রায় পৌনে তিন লাখ কোটি টাকা কর ছাড় বা মওকুফ করেছে। কর হার কমিয়ে আদায় নিশ্চিত করার প্রস্তাব করেছে জামায়াত।
এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি বন্ধ করতে এবং সৎভাবে কাজ করতে উৎসাহিত করার জন্য বিশেষ ‘ঝুঁকি ভাতা’ বা প্রণোদনা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ অর্থনীতি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত—এমন তথ্য দিয়ে জামায়াত এগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে বার্ষিক কমপক্ষে ২০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায়ের প্রস্তাব করেছে।
শিক্ষা ব্যয়কে বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করে আয়করে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করেছে জামায়াত। এতে বলা হয়েছে, যদি কোনো পরিবারের আয় সাড়ে চার লাখ টাকার বেশি হয় এবং সেই পরিবারের কোনো সদস্য বা পোষ্যের বার্ষিক শিক্ষা ব্যয় ৫০ হাজার টাকার বেশি হয়, তাহলে তা আয়কর থেকে বাদ যাবে। দুটি পরিবারের আয় যদি সমান হয়, তাহলে যে পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি, তারা পোষ্যপ্রতি বছরে ৫০ হাজার টাকা কর রেয়াত পাওয়ার প্রস্তাব করেছে জামায়াত। দেশের দুই হাজার ডিগ্রি কলেজকে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে শিক্ষাখাতে গবেষণা জিডিপির দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে জামায়াত। শিক্ষা সহায়তা তহবিল থেকে জাকাত পাওয়ার যোগ্য দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাসে তিন হাজার টাকা অনুদান এবং স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাসে ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ছায়া বাজেটে।
চিকিৎসা ব্যয় বাবদ বাংলাদেশিরা বছরে বিদেশে ৫ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যায় জানিয়ে জামায়াতের বাজেটে দেশে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে আটটি বিশ্বমানের হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বেকার ও কর্মসংস্থান প্রত্যাশীদের ডেটাবেইস তৈরি করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি করে উদ্যোক্তা তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে ছায়া বাজেটে। কৃষিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে হেক্টর প্রতি কৃষি উৎপাদন অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কের অন্তত অর্ধেকে উন্নীত করতে গবেষণায় বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আবাসন খাত ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য তৈরির প্রস্তাব করেছে জামায়াত। এতে বলা হয়েছে, ১ হাজার ২০০ বর্গফুটের কম আয়তনের ফ্ল্যাটের গৃহঋণের সুদ ও মেয়াদ এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে মাসিক ভাড়ার টাকায় একজন ব্যক্তি ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারেন। মাসে ২০ হাজার টাকার কম আয় করেন এমন ব্যক্তিদের ৬০০ বর্গফুটের কম আয়তনের ফ্ল্যাট কিনতে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে জামায়াত; সুদ বাবদ ভর্তুকি সরকার দেবে। গৃহনির্মাণের সব সামগ্রীতে কর হার অন্তত অর্ধেক কমাতে হবে। এতে যে রাজস্ব ক্ষতি হবে, এর চেয়ে বেশি আয় হবে বাড়ি ও ফ্ল্যাট নির্মাণ ব্যাপক বৃদ্ধির ফলে।
বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী, মা ও শিশু এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর ভাতা চলতি অর্থবছর থেকেই মাসে এক হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে জামায়াত। ধাপে ধাপে তা মাসিক তিন হাজার টাকা নির্ধারণের পরিকল্পনা জানিয়েছে।
ছায়া বাজেট উপস্থাপনের পর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘আর্থিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, সাংবিধানিক সব জায়গায় নির্লজ্জ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আজ স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা কর্পোরেশন—সবগুলোয় থাবা বিস্তৃত হচ্ছে। সমাজের অপরাধী লোকদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘বিরোধী দলের প্রস্তাবিত বাজেট থেকে যদি সরকার ভালো কিছু গ্রহণ করে, তবে জনগণ উপকৃত হবে।’ বিরোধীদলীয় নেতা জুলাই থেকে জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থবছর নির্ধারণের প্রস্তাব করেন। তা সংসদেও তুলে ধরা হবে জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘মে ও জুন বর্ষা ও দুর্যোগের মাস। দেখা যায়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বড় অংশ এই দুই মাসে তাড়াহুড়ো করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। বর্ষার পানিতে কাজ নষ্ট হয়।’
সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, জাগপার সভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান এমপি, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ড. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এবি পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি, মুজিবুর রহমান এমপি, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা।
- বিষয় :
- জামায়াতে ইসলামী
- বাজেট
- রাজস্ব
