গোলটেবিল বৈঠকে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ
বাণিজ্যচুক্তি নয়, এটি মার্কিন প্রশাসনের হুকুমনামা
আনু মুহাম্মদ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তির কঠোর সমালোচনা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেছেন, বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি আদৌ সাধারণ বাণিজ্যচুক্তির মধ্যে পড়ে কিনা– ভাববার বিষয়। এটিকে বাণিজ্যচুক্তি বলাও যায় না। এটি মূলত মার্কিন প্রশাসনের একটি হুকুমনামা, যাতে বাংলাদেশ কী কী করতে বাধ্য থাকবে, তা একতরফাভাবে ঠিক করে দেওয়া হয়েছে।
গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি: হুমকিতে দেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আনু মুহাম্মদ এসব কথা বলেন। বাম ও প্রগতিশীল ১৩টি দলের সমন্বয়ে গঠিত সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট এ সভার আয়োজন করে।
আনু মুহাম্মদ বলেন, এই বাণিজ্যচুক্তিতে ঘাটতি বাণিজ্যের যুক্তি দেখিয়ে বাংলাদেশকে বেশি দামে মার্কিন পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক। চুক্তিটি পড়লে মনে হয়, এখানে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ প্রবাদের চেয়েও বেশি বাধ্যবাধকতা। চুক্তিতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধিবিধান বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বীকৃত নীতিমালার প্রতিফলনও নেই।
চুক্তি সইয়ের সময় নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার নিজেদের গরজ ও আগ্রহে চুক্তি সই করেছে। অথচ বিষয়টি নিয়ে নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করানো যেত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারতসহ বেশির ভাগ দেশ এ ধরনের চুক্তি এড়িয়ে গেছে বা আলোচনার স্তরে আছে। অথচ বাংলাদেশ স্বেচ্ছায় এগিয়ে গিয়ে ও নিজ দায়িত্বে চুক্তি করেছে। যারা এই চুক্তি করেছে, তারা মূলত মার্কিন পক্ষেরই লোক।
নির্বাচিত সরকার এসেও চুক্তি অব্যাহত রেখেছে উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে গম, তুলা, মাছ বা মাংস আমদানি করতে হলে একদিকে রাজস্ব কমবে, অন্যদিকে ভর্তুকি বাড়বে। সেই বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ঘাড়েই পড়বে। ওষুধ ও ডেইরি শিল্প, আইটি, ই-কমার্স খাত, গ্যাস সম্পদ– সবকিছু এই চুক্তির আওতায় ঝুঁকিতে পড়বে। কেননা, বেশি দামে পণ্য আমদানি করলে তা দেশীয় বাজারে বিক্রি হবে না। ফলে সরকারকে সেখানে ভর্তুকি দিতে হবে এবং রাষ্ট্র রাজস্ব হারাবে।
গোলটেবিল বৈঠকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান চুক্তিটিকে ‘একপক্ষীয় এবং অসম’ উল্লেখ করে তা বাতিলের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নির্বাচনের তিন দিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তিটি সই হয়; ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন আদালত অতিরিক্ত শুল্ক বাতিল করে দেন। অল্প কয়েক দিন অপেক্ষা করলে এ চুক্তির প্রয়োজনই পড়ত না।
চর্চার সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, অনেকে মনে করেন, বামপন্থিরা বিভক্ত, তাদের শক্তি নেই, সংসদেও নেই। কিন্তু জনগণের পক্ষে জাতীয় স্বার্থে বামপন্থিরাই রাজপথে সোচ্চার আছে। বাণিজ্যচুক্তি অধীনতা ও দাসত্বের। এটা মানা যাবে না। বর্তমানে সরকারি দল ও বিরোধী দল সবাই একটি বিষয়ে এক। সেটা হচ্ছে– আমেরিকা অখুশি হবে এমন কিছু করা যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তার কোনো বিষয়ই প্রাধান্য পায়নি। মনে হচ্ছে, মার্কিন নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে চলে যাচ্ছে দেশ। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, তাদের রুখতে হলে বাকি সব দেশকে একত্র হতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের সর্বনাশ করে গেছে। তাদের করা বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবে দাসত্বের চুক্তি; দেশ বিক্রির গোলামি চুক্তি। এই চুক্তি বাতিলে সরকারকে বাধ্য করতে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
বৈঠকে সূচনা বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন। আরও বক্তব্য দেন বিসিকের সাবেক পরিচালক আবু তাহের খান ও বিজিএমইএর সহসভাপতি ইনামুল হক খান।
- বিষয় :
- আনু মুহাম্মদ