ঢাকা বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

আদায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে ৩ বছরের কর্মপরিকল্পনা

আদায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে ৩ বছরের কর্মপরিকল্পনা
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৮:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে আদার চাহিদা প্রতিবছর বাড়লেও উৎপাদন সেই হারে বাড়ছে না। ফলে দেশের চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে। এই আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আগামী তিন বছরের মধ্যে আদা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে নতুন কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। 

পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের চার পার্বত্য জেলায় নতুন করে চার হাজার হেক্টর জমিতে আদার আবাদ সম্প্রসারণ করা হবে। পাশাপাশি আম বাগান, লিচু বাগান, বসতবাড়ি ও পতিত জমিতে বস্তাভিত্তিক আদা চাষ বাড়ানো হবে। এতে অতিরিক্ত এক লাখ ৪৮ হাজার টন আদা উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় তিন লাখ ৭৫ হাজার টন আদার চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় দুই লাখ ৫৫ হাজার টন। ফলে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণে বিপুল পরিমাণ আদা আমদানি করতে হচ্ছে। যার জন্য প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে আদার চাহিদা ছিল তিন লাখ ৭০ হাজার টন। ওই বছর উৎপাদন হয়েছিল দুই লাখ ৪৫ হাজার টন। ঘাটতি ছিল এক লাখ ২৫ হাজার টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে চাহিদা ছিল তিন লাখ ৫০ হাজার টনের। উৎপাদন হয় দুই লাখ ৪৭ হাজার টন, ঘাটতি ছিল এক লাখ তিন হাজার টন।

পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি। ওই বছর চাহিদা ছিল তিন লাখ চার হাজার টন, উৎপাদন হয় দুই লাখ ৪৭ হাজার টন এবং ঘাটতি ছিল ৫৭ হাজার টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবার ঘাটতি বেড়ে যায়। ওই বছর চাহিদা ছিল তিন লাখ ৯৬ হাজার টন, উৎপাদন হয় দুই লাখ ৫৮ হাজার টন। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় এক লাখ ৩৮ হাজার টন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চাহিদা প্রায় তিন লাখ ৭৫ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন হয়েছে দুই লাখ ৫৫ হাজার টন। ফলে ঘাটতি রয়েছে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে এক লাখ ৬৭ হাজার টন আদা আমদানি করা হয়। প্রতি কেজির গড় মূল্য ১০০ টাকা ধরে এর আর্থিক মূল্য প্রায় এক হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল এক লাখ ৪৯ হাজার টন, যার মূল্য প্রায় এক হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি কমে ৯১ হাজার টনে নেমে এলেও ব্যয় হয় প্রায় ৯১০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবার আমদানি বেড়ে এক লাখ ৫৯ হাজার টনে পৌঁছায়, যার মূল্য প্রায় এক হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত এক লাখ ৩৫ হাজার টন আদা আমদানি হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় এক হাজার ৩৫০ কোটি টাকা।

আমদানিনির্ভরতা কমাতে সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কৃষি বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা ও চাষিদের সঙ্গে পরামর্শ করে আদা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের রূপরেখা নির্ধারণ করেছেন। এর ভিত্তিতে তিন ধাপে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে অতিরিক্ত এক হাজার হেক্টর জমিতে আদা চাষ সম্প্রসারণ করা হবে। পাশাপাশি প্রায় তিন কোটি বস্তায় আদা চাষের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে অতিরিক্ত ৩৭ হাজার টন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে আরও দুই হাজার ৫০০ হেক্টর জমি এবং আট কোটি বস্তাকে উৎপাদনের আওতায় আনা হবে। ওই বছর অতিরিক্ত ৯৬ হাজার টন উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। আর ২০২৮-২৯ অর্থবছরে মোট চার হাজার হেক্টর জমি এবং ১২ কোটি বস্তায় আদা চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে অতিরিক্ত এক লাখ ৪৮ হাজার টন উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রায় এক হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী চট্টগ্রাম, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় নতুন করে এক হাজার হেক্টর করে মোট চার হাজার হেক্টর জমিতে আদা চাষ সম্প্রসারণ করা হবে। এসব এলাকা থেকে অতিরিক্ত ৬৪ হাজার টন আদা উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি আম বাগান, লিচু বাগান, বসতবাড়ি ও পতিত জমিতে বস্তাভিত্তিক আদা চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে আরও ৮৪ হাজার টন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অনাবাদি পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙিনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্পের মাধ্যমে তিন লাখ ৮০ হাজার বস্তায় আদা চাষ হয়েছে। এই প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. আকরাম হোসেন চৌধুরী বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলগুলো আদা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হলেও সেই সম্ভাবনার পুরোটা এখনও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। একই সঙ্গে বসতবাড়ি, ফল বাগান ও পতিত জমিতেও আদা চাষ সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের অধীনে ৪০ জেলায় ২৮ লাখ বস্তায় আদা উৎপাদন হয়েছে। মসলা প্রকল্পের পরিচালক রাসেল আহমেদ বলেন, আম বাগান ও লিচু বাগানে আন্তঃফসল হিসেবে আদা চাষ, বসতবাড়িতে বস্তাভিত্তিক চাষ এবং পাহাড়ি অঞ্চলের পতিত জমি ব্যবহারের মাধ্যমে খুব দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশে আদার বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। রান্নার পাশাপাশি ওষুধ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং বিভিন্ন পানীয় তৈরিতে আদার ব্যবহার বাড়ছে; কিন্তু উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ায় প্রতিবছর আমদানির ওপর নির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধি ও আমদানি কমাতে এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তিন বছরের মধ্যেই দেশে আদার উৎপাদনে বড় ধরনের অগ্রগতি হবে। একই সঙ্গে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং কৃষকের আয়ও বাড়বে।

আরও পড়ুন

×