ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

পুলিশ কর্মকর্তার জবানবন্দি

সাবেক এসপির নির্দেশে ছাত্রদল নেতাসহ দুজনকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হয়

সাবেক এসপির নির্দেশে ছাত্রদল নেতাসহ দুজনকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হয়
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ২২:২৯ | আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ | ২২:৩৬

বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ক্রসফায়ারে ছাত্রদল নেতাসহ দুজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় জবানবন্দি দিয়েছেন পুলিশ পরিদর্শক অসীম কুমার সিকদার। তার দাবি, ওই দুই ছাত্রনেতাকে ‘ক্রসফায়ার’ দিতে তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বরিশালের তৎকালীন পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহ। তবে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন, চাকরি ছেড়ে দিতে রাজি আছি। কিন্তু এ কাজ করতে পারব না।

বুধবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ প্রথম এই সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

এ মামলায় মোট আসামি চারজন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন উজিরপুর থানার সাবেক দুই এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন। পলাতক অপর দুজন হলেন—বরিশাল-১ আসনের সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার এ কে এম এহসান উল্লাহ।

অসীম কুমার সিকদার বর্তমানে বরিশাল সদর নৌ-থানায় অফিসার ইনচার্জ (পুলিশ পরিদর্শক) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৫ সালের ১২ মে পর্যন্ত বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি।

জবানবন্দিতে অসীম কুমার বলেন, বরিশালের আগৈলঝাড়া থানার কেউ রাজি না হওয়ায় পাশের উজিরপুর থানা থেকে পুলিশ এনে ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে জেলাটির সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসান উল্লাহ ক্রসফায়ার দেন। এ মামলায় প্রথম সাক্ষী জবানবন্দি দেওয়ার আগে ট্রাইব্যুনালে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার।

জবানবন্দিতে পুলিশ পরিদর্শক অসীম কুমার সিকদার বলেন, ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাত দেড়টার দিকে আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলামের মাধ্যমে জানতে পারেন, আগৈলঝাড়া থানাধীন বুধার সাকিনের বাইপাস মহাসড়কে কে বা কারা একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দিয়েছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ওসি তাকেযেতে বলেন। সেখানে গিয়ে ফলবাহী পিকআপে আগুন জ্বলতে দেখতে পান। রাত পৌনে দুইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ডিউটি শেষে থানায় এলে ওসি বলেন, বাদী না থাকায় তাঁকেই (সাক্ষী) এ বিষয়ে মামলা করতে হবে। এরপর বাধ্য হয়ে এজাহারে সই করেন তিনি। সেই এজাহারের ভিত্তিতে মামলা হয়।

২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি এসপি এহসান উল্লাহ আগৈলঝাড়া থানায় আসেন উল্লেখ করে জবানবন্দিতে অসীম কুমার সিকদার বলেন, এসপি এসে ওসির কক্ষে বসেন এবং তাকেডেকে পাঠানো হয়। তিনি (সাক্ষী) এলে এসপি তাকেউদ্দেশ করে বলেন, অগ্নিকাণ্ডের মামলায় এসআই নজরুল ইসলাম ঢাকা থেকে দুজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। আসামিদের নিয়ে আসা হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ আছে তাদেরক্রসফায়ার দিতে হবে। এ কাজ তোমাকেই করতে হবে। তবে তিনি এ কাজে রাজি না হলে পুলিশ সুপার তাকেগালাগাল করেন এবং ওসির কক্ষ থেকে বের করে দেন। পরে জানতে পারেন, পুলিশ সুপার এভাবে আগৈলঝাড়া থানার সব অফিসারকে ডেকে নিয়ে একই প্রস্তাব দেন এবং কেউ রাজি হননি।

পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি রাত ১টার দিকে আগৈলঝাড়া থানার উত্তর দিকে বাইপাস ব্রিজে দায়িত্ব পালন করছিলেন উল্লেখ করে অসীম কুমার সিকদার বলেন, রাত ২টার দিকে পুলিশ সুপারের গাড়ি তাদেরঅতিক্রম করে বুধার এলাকার দিকে যায়, যার পেছনে একটি মাইক্রোবাস ছিল। রাত সোয়া দুইটার দিকে বাইপাস ব্রিজ থেকে আধা কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণ দিক থেকে কয়েকটি গুলির শব্দ শুনতে পান তিনি। আগুনের শিখার মতো কিছু একটা দেখতেও পান তিনি। শেষ রাতের দিকে তিনি থানায় ফিরে যান।

সকালে ওসি বলেন, রাত সোয়া দুইটার দিকে গ্রেপ্তার আসামি আগৈলঝাড়া উপজেলার ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক মো. টিপু হাওলাদার এবং আগৈলঝাড়া উপজেলা জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. কবির হোসেনকে ক্রসফায়ার দেওয়া হয়েছে। আগৈলঝাড়া থানার কোনো অফিসার ও ফোর্স এ ঘটনা সংঘটনে রাজি না হওয়ায় পুলিশ সুপার পার্শ্ববর্তী উজিরপুর থানা থেকে এএসআই মাহবুল ও এএসআই জসিমকে নিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন।

এরপর পরদিন সকালে নিহতদের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে তাদের লাশ আত্মীয়-স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

আরও পড়ুন

×