পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি
অর্থাভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ ৭৮ শতাংশ কমেছে
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ০৮:৫০ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ | ১০:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
সরকারিভাবে বিতরণ করা জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পাঁচ ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণের সরবরাহ প্রায় ৭৮ শতাংশ কমে গেছে। দেড় বছর ধরে এমন সংকট চলছে। দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকার পর জন্মহার বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
পরিবার পরিকল্পনাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়ন সহযোগীরা বলছেন, অর্থ সংকট, ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা এবং বাজেট বাস্তবায়নের জটিলতার কারণে এই সংকট দেখা দিয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায় থেকে চাহিদা দিলেও অর্থাভাবে ব্যবস্থা নিতে পারেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার কমে যাওয়া এবং প্রজনন হার বাড়ার ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপরিকল্পিত গর্ভধারণ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে জনসংখ্যা বাড়ার হার, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি এবং ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণের সংখ্যা বাড়বে। একই সঙ্গে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের গত রোববার বিকেলের তথ্য বলছে, দেশের ৩৭৮ উপজেলায় কনডম নেই। ৩৬৭ উপজেলায় ওরাল পিলের মজুত শেষ। জরুরি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি (ইসিপি) নেই ৪১৮ উপজেলায়। তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি সুরক্ষাদানকারী ইমপ্লান্ট নেই ৩১১ উপজেলায় এবং ১০ বছর কার্যকর আইইউডি নেই ৩৯৭ উপজেলায়। ইনজেক্টেবল জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর মজুতও শেষ হয়ে গেছে ৪৭৭ উপজেলায়। শুধু জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ নয়, মাতৃস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় মিসোপ্রোস্টল, অক্সিটোসিন, আয়রন-ফলিক এসিড ও ম্যাগনেসিয়াম সালফেটের মতো ওষুধও অধিকাংশ উপজেলায় এখন মজুতশূন্য।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সক্ষম দম্পতিদের ৩৭ শতাংশ সরকারি খাত থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী পান। এনজিওদের কাছ থেকে পান ৩ শতাংশ। বাকি ৬০ শতাংশ পান বেসরকারি খাত থেকে। ফলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ধরনের উপকরণের মধ্যে ইনজেক্টেবলের সরবরাহ পাঁচ লাখে নেমে এসেছে। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৪০ হাজার। অর্থাৎ সরবরাহ প্রায় ৫৬ শতাংশ কমেছে। মুখে খাওয়ার পিলের সরবরাহ ৮৮ লাখ ৯০ হাজার থেকে কমে হয়েছে ১৮ লাখ ৯০ হাজার। কমেছে প্রায় ৭৯ শতাংশ।
আরও আশঙ্কাজনক চিত্র দীর্ঘমেয়াদি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ক্ষেত্রে। আপন ব্র্যান্ডের মুখে খাওয়ার পিলের সরবরাহ ২৩ লাখ ৪ হাজার ৯৪৩ পিস থেকে কমে হয়েছে মাত্র ৪৩ হাজার ৭৬৮ পিস; ৯৮ শতাংশ কমেছে। ইমপ্লান্টের সরবরাহ ২৯ লাখ ৮৩ হাজার থেকে নেমে হয়েছে ৯ হাজার ৭৫২টিতে, অর্থাৎ প্রায় ৯৭ শতাংশ কমেছে। জরায়ুর ভেতরে স্থাপনযোগ্য গর্ভনিরোধক যন্ত্র (আইইউডি) ১৯ হাজার ৬৯১ থেকে কমে হয়েছে ৭ হাজার ২৮৩, যা প্রায় ৬৩ শতাংশ কম। সরকারি সেবার এই অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে দেশের জনসংখ্যার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলায় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী নেই
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং স্যাটেলাইট ক্লিনিকে সাধারণত কনডম, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, ইনজেকশন, ইমপ্লান্টসহ বিভিন্ন পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী বিনা মূল্যে সরবরাহ করা হয়। তবে বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় সামগ্রী না পেয়ে সেবাগ্রহী অনেকেই বাজার থেকে টাকা দিয়ে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
কয়েকটি উপজেলার বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নিয়মিতভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পাওয়া গেলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ উপকৃত হন। সরবরাহ না থাকায় তাদের বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী সংগ্রহ করেন সাধারণত দরিদ্র মানুষ। প্রয়োজনের সময় তারা দোকান থেকে কিনবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ কারণে দরিদ্র পরিবারগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী সংগ্রহের সময় মানুষ সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু স্বাস্থ্যসেবা বা পরামর্শ নিয়ে থাকেন। তাতেও ছেদ পড়তে পারে।
বাড়ছে প্রজনন হার
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৮১ সালে দেশে মোট প্রজনন হার (টিএফআর) ছিল ৫ দশমিক ০৭। ১৯৯৪ সালে তা কমে ৩-এ নেমে আসে। ২০১২ সালে ছিল ২ দশমিক ৩ এবং ২০২২ সাল পর্যন্ত একই অবস্থায় ছিল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) ২০২৫ অনুযায়ী, এই হার এখন বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সংকটের কারণে প্রজনন হার বাড়তে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
ওপি ব্যবস্থা বন্ধ হওয়ায় সংকট
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায় অপারেশন প্ল্যান (ওপি) থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও মাতৃস্বাস্থ্যের জরুরি উপকরণ কেনা হতো। তবে ২০২৫ সালে ওপি ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নতুন প্রকল্প অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হয়। ফলে ক্রয় কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
জানতে চাইলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন বলেন, প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী মজুত নেই। পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর ক্ষেত্রে অন্তত ছয় মাসের বাফার স্টক থাকার কথা, কিন্তু এখন বড়ি, ইনজেকশন, ইমপ্লান্ট, আইইউডি–কোনোটিরই পর্যাপ্ত মজুত নেই। তিনি বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় এক মাসের বিঘ্নও বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনে। এক ডলারের সরবরাহ ব্যাহত হলে দীর্ঘ মেয়াদে প্রায় ১৪ ডলারের সমপরিমাণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।
সংকট কাটাতে এক হাজার কোটি টাকা
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (উপকরণ ও সরবরাহ) মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রয়চক্র সম্পন্ন করতে কমপক্ষে ১২০ দিন সময় লাগে, যা সময়মতো শুরু করা সম্ভব হয়নি। ২০২৩ সাল থেকেই এ সংকট দেখা দেয়। সর্বশেষ ওপি বন্ধ হয়ে গেলে এই সংকট প্রকট হয়।
সংকট মোকাবিলায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কেনার জন্য এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে কনডম, পিল, ইনজেকশন, ইমপ্লান্ট, আইইউডিসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনা হবে। সরকার আশা করছে, নতুন সরবরাহ আসার মাধ্যমে চলমান ঘাটতি অনেকটাই কমে আসবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; সময়মতো ক্রয়, পর্যাপ্ত মজুত এবং কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে না পারলে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা যে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তা স্পষ্ট। সরকারের উচিত দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে এমন সংকট এড়াতে টেকসই ক্রয় ও মজুত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।
জানতে চাইলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা সমকালকে বলেন, ২০২৩ সালে বড় ধরনের ক্রয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়। ২০২৪ সালের জুনে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) মেয়াদোত্তীর্ণ হলে সংকট আরও তীব্র রূপ নেয়। তবে সরকার নতুন করে বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে এবং এ খাতে উল্লেখযোগ্য অর্থ সংস্থান করা হয়েছে।