বসুন্ধরার সঙ্গে বিএনপির ‘সমঝোতা’ আছে কিনা, জানতে চান হাসনাত
সংসদে বক্তব্য রাখছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ২১:৫০ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২৬ | ২২:২২
বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের ধরতে বাজেটে কী উদ্যোগ রয়েছে সেই প্রশ্ন রেখে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘পাচারকারীরা গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিতে এখন বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বসুন্ধরার সায়েম সোবহান আনভীর দেশে ঢোকার সাহস পাননি। কিন্তু এই সরকার নির্বাচিত হয়ে আসার পর সোবহান পুত্র দেশে ঢুকেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বসুন্ধরার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এই মামলার কী অগ্রগতি হয়েছে, সেটা আমরা জানতে চাই। জানতে চাই আন্ডার টেবিল কোনো ধরনের সমঝোতা হয়েছে কিনা। যদি সমঝোতা না হয়ে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধাটা কোথায়?’
ব্যাংক ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে বসুন্ধরার চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে গত ডিসেম্বরে মামলা করে দুদক। গত ফেব্রুয়ারিতে দুদক জানিয়েছিল, আকবর সোবহানসহ তার পরিবারের ২৬ জনের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের মামলা করা হবে। কিন্তু পরে এই মামলা হয়নি। এই প্রশ্ন তুলে হাসনাত বলেন, ‘তাদের খুঁটির জোর কোথায়, সেটা আমরা জানতে চাই।’
শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের সঙ্গে বিএনপি সরকারের কোনো ‘আন্ডার টেবিল সমঝোতা’ আছে কিনা—সংসদে সেই প্রশ্নও তুলেছেন এনসিপির এই সংসদ সদস্য। বৃহস্পতিবার সংসদের বৈঠকে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে ঋণখেলাপিদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, কোনো এমপি নির্বাচনের পরও ঋণখেলাপি হলে তার সদস্য পদ বাতিলে আইন করতে হবে।
একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি হ্রাস এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করায় অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করে হাসনাত বলেন, ‘তিনি কম তেলে মচমচে ভাজতে চান।’ পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি চার মাসে কত চাকরি তৈরি করেছে—তা সরকারের কাছে জানতে চান হাসনাত আবদুল্লাহ।
‘যারা আগে রিকশায় চড়তেন, তারা জুলাই চেতনা বিক্রি করে এখন প্রাডোতে চড়েন’—বিএনপির এমপি আখতারুজ্জামান বাচ্চুর এই বক্তব্যে চ্যালেঞ্জ দিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, এক টাকার অনিয়ম প্রমাণ করতে পারলে তিনি সংসদ থেকে পদত্যাগ করবেন।
হাসনাত অভিযোগ করেন, বিএনপির নেতা ও এমপিদের কয়েকজন বসুন্ধরার সঙ্গে যুক্ত। তিনি এমপিদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের দলের কিছু কিছু মানুষ বসুন্ধরার অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করেন; তাদের মিডিয়ার অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করেন। যেই মিডিয়া তারেক রহমানকে দেশদ্রোহী হিসেবে ফ্রেমিং করেছে, সেই বসুন্ধরা গ্রুপে আজকে এই সংসদের সরকারি দলীয় সংসদ সদস্যদের অনেকেই যুক্ত। বসুন্ধরার বিরুদ্ধে যারা কথা বলেন, তাদের বিরুদ্ধে মিডিয়া লেলিয়ে দেওয়া হয়।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি বলেছেন, তিনি প্রতিহিংসা নিতে চান না। এই বক্তব্য টেনে হাসনাত বলেন, ‘যারা ঋণখেলাপি, যারা ব্যাংকগুলোকে দখল করেছেন, যারা গণতন্ত্রের পথকে রুদ্ধ করেছেন, গুম-খুনের বৈধতা উৎপাদন করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ দেখতে চাই। প্রধানমন্ত্রী প্রতিশোধপরায়ণ হননি, একে স্বাগত জানাই। তবে প্রতিশোধপরায়ণ না হওয়া আর সুবিচার নিশ্চিত না করা এক নয়।’
স্পিকারের কাছে সুরক্ষা চেয়ে হাসনাত বলেন, একজন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলায় সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আমরাও বলতে ভয় পাই। কারণ আমরা যদি সরকারের সমালোচনা করি, কোনো প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলি, মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলি—আমার এলাকার বাজেট যে বন্ধ করে দেওয়া হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সেই কারণে আমাদের মধ্যেও অনেকেই কথা বলার সময় আওয়াজটা একটু কম করে বলেন। অনুরোধ করি, আমার জন্য আমার এলাকার মানুষকে যেন বঞ্চিত করা না হয়।
বাজেট আলোচনায় হাসনাত আরও বলেন, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে রাজস্ব আয় হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। বছর শেষে তা ৪ লাখ কোটি টাকা হতে পারে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। সরকারের কাছে কী এমন মেকানিজম রয়েছে যে ৭৫ শতাংশ রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে?
কর ব্যবস্থার সমালোচনা করে হাসনাত বলেন, ‘বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টির কথা বলা হচ্ছে, অথচ বাংলাদেশে ১০০ টাকায় করপোরেট ট্যাক্স দিতে হয় সাড়ে ২৭ শতাংশ। ডিভিডেন্ড ট্যাক্স ও সারচার্জসহ দিতে হয় ৪০ শতাংশ; সিঙ্গাপুরে যা শূন্য শতাংশ। তাহলে কেন একজন ব্যবসায়ী সিঙ্গাপুর রেখে বাংলাদেশে আসবেন?’
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিত্যপণ্যে কর কমানোর কৃতিত্ব নিচ্ছেন এবং জনগণ বাহাবা দিয়েছে। অথচ অর্থমন্ত্রী মুদি দোকান, কাপড়ের দোকানসহ ১৬ রকমের ক্ষুদ্র ব্যবসায় কর বসাচ্ছেন। এটি একটি সাংঘর্ষিক অবস্থা; করের বোঝা দিন শেষে সাধারণ মানুষের ওপরই চেপে বসবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাসনাত বলেন, পাঁচ বছরে এক কোটি হিসেবে চার মাসে ছয় লাখ চাকরি তৈরি হওয়ার কথা। অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন—চার মাসে কয়টি কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে? চাকরিগুলো কোথায়?
‘ঋণ করে ঘি খাও’—এই শ্লোক পাঠ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সরকারি দলের কিছু এমপি এটি খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। উনারা এভাবে নিয়েছেন—‘ঋণ করো, ঋণখেলাপি হও, তাও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করো’। বাজেটে কোথাও উল্লেখ নেই কীভাবে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ফেরত আনা হবে। গভর্নর মাঝে মাঝে আক্ষেপ করে বলেন, ব্যাংক ঋণের ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পাঁচ বছর কোনো খোঁজখবর থাকে না, তফসিলের আগে আদালতে গিয়ে খেলাপি ঋণের ওপর স্থগিতাদেশ নেয়, দুই শতাংশ দিয়ে পুনঃতফসিল করে নির্বাচনে অংশ নেয়। জনগণের টাকা নিয়ে এই বিলাসিতা বন্ধ করতে হবে। ঋণখেলাপিদের ঋণখেলাপিই বলতে হবে। আমরা লজ্জা পাই একই সংসদ একসঙ্গে শেয়ার করার জন্য। জনগণের টাকা মেরে যারা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে আসেন, সেই ঋণখেলাপিদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
- বিষয় :
- সংসদ
- বসুন্ধরা
- হাসনাত আবদুল্লাহ
