মাদকের মামলা
সাক্ষীর অনীহায় খালাস পাচ্ছেন আসামিরা
বকুল আহমেদ
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৯:০৯ | আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬ | ১০:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর পান্থপথে ১৪ বছর আগে ২০০টি ইয়াবা বড়িসহ র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) হাতে আটক হন ইব্রাহিম শেখ। র্যাব-২ এর তৎকালীন উপসহকারী পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান বাদী হয়ে ২০১২ সালের ১৪ মে ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় মামলা করেন। ১১ জুন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক এএফএম সায়েদ।
অভিযোগপত্রে মোট সাক্ষী ১১ জন। তাদের মধ্যে র্যাব ও পুলিশের সদস্য ৯ জন এবং দুজন সাধারণ মানুষ। অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মামলার বিচার কাজ। সাক্ষ্য দেন শুধু বাদী। তদন্ত কর্মকর্তাসহ অন্য ১০ জন আদালতে হাজির হননি। গত ৫ মে ঢাকার একটি আদালত মামলার রায় ঘোষণা করেন। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে অভিযুক্ত ইব্রাহিম বেকসুর খালাস পান।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই মামলার মতো সারাদেশের অধিকাংশ মাদক মামলায় সাক্ষীরা আদালতে হাজির হন না। যদিও আইন অনুযায়ী আদালতে সাক্ষীদের হাজির করা এবং অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব রাষ্ট্রপক্ষের। কিন্তু সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে বেশির ভাগ আসামি খালাস পান।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সারাদেশের আদালতে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৮৫টি মাদক মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। ১ লাখ ৫০ হাজার ১৫৫ জন আসামি মুক্তি পেয়েছেন। খালাসের হার ৫৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদক মামলায় খালাসের উচ্চ হার এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করে। এতে মাদক ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত হয়।
দেশে ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত
ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের চাহিদা ও সরবরাহ বাড়ছে। আগে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ লাখ। বর্তমানে সেই সংখ্যা ৮২ লাখ। মাদকাসক্তদের বড় একটি অংশ তরুণ। উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় মাদক গ্রহণ শুরু হয় ১৮ বছরের আগেই। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) এবং রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেডের (আরএমসিএল) যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি।
এই প্রেক্ষাপটে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার নিয়ে আজ শুক্রবার মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস পালিত হচ্ছে।
এ উপলক্ষে দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তাদের এবারের প্রতিপাদ্য- ‘বিশ্ব মাদক সমস্যা: বিদ্যমান সংকট, নতুন চ্যালেঞ্জ ও উদ্ভাবনী সমাধান।’ দিবসটি ঘিরে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চললেও দেশে মাদকের বিস্তার, নতুন মাদকের আবির্ভাব ও পাচারকারীদের নিত্যনতুন কৌশল মোকাবিলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে ডিএনসি, পুলিশ, র্যাব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ডের আলাদা অভিযানে ১ কোটি ৮৫ লাখ ১২ হাজার ৬৪টি ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। ৯৫ কেজি হেরোইন, ১৭ কেজি কোকেন, ৭ কেজি আফিম, ৩৩ হাজার ৬১৮ কেজি গাঁজা, সাড়ে ৮ কেজি আইস, ৬ কেজি কিটামিন, ৩৮ হাজার ৬৬৫ বোতল ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়। মে ও চলতি মাসের মাদক উদ্ধার সংক্রান্ত সব সংস্থার তথ্য এখনও একত্র করা হয়নি।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গত মে পর্যন্ত দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মাদক মামলার সংখ্যা ৬ লাখ ৬১ হাজার ৯৫২টি। গত চার মাসে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৪ জনকে।
মামলার মূল ভিত্তি তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ
কী কারণে মাদক মামলায় সাজার চেয়ে খালাসের হার বেশি এবং এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী– জানতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, আইনজীবী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা হয়। তাদের মতে, কোনো মামলা প্রমাণে মূল ভিত্তি সঠিক তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ। পাশাপাশি ত্রুটিমুক্ত এজাহার, নির্ভুল অভিযোগপত্র এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় আলামত জব্দ ও সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে মামলার বাদী, তদন্ত কর্মকর্তা কিংবা অন্যান্য সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিতে হাজির হন না। ঠিকভাবে জব্দ তালিকা প্রস্তুত না করা, আলামত সংগ্রহ ও সংরক্ষণে ত্রুটি থাকা এবং তদন্তে অসংগতি মামলার দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া মামলা দায়ের থেকে বিচার নিষ্পত্তি পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগে যায়। দীর্ঘ সময়ে মামলার বাদী, তদন্ত কর্মকর্তা কিংবা ভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যরা দেশের বিভিন্ন স্থানে বদলি হয়ে যান। ফলে সাক্ষ্য দিতে অনেকে উপস্থিত হন না।
অন্যদিকে সাধারণ সাক্ষী অনেকের ঠিকানা পরিবর্তন হয়ে যায়। অনেকেই নিজের কাজ ফেলে আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দেওয়াকে বাড়তি ঝামেলা মনে করেন। এ ছাড়া সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিত হওয়ার জন্য পাঠানো সমনও অনেক সময় তাদের হাতে পৌঁছায় না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাক্ষীদের কাছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতের সমন পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মাদক মামলায় এজাহার, তদন্ত ও অভিযোগপত্র প্রস্তুতির প্রতিটি ধাপে আরও পেশাদারিত্ব ও সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মাদকের ঘটনায় বাহক ও মাদকসেবীরা গ্রেপ্তার হন। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে বড় ব্যবসায়ীরা মামলায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পান।
৫ বছরে খালাস দেড় লাখের বেশি
পুলিশ সদরদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ঢাকাসহ সারাদেশের আদালতে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৮৫টি মাদক মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৭৬ হাজার ১৬৮ মামলায় সাজা হয়েছে, যা মোট মামলার ৪০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এদিকে ১ লাখ ১১ হাজার ৭১৭ মামলা খালাস হয়েছে, যা ৫৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এসব মামলার ১ লাখ ৫০ হাজার ১৫৫ আসামির সবাই মুক্তি পেয়েছেন।
পাঁচ বছরে সাজা হওয়া মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে সাজার হার কিছুটা বেড়েছে; ৪৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। সাজাপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যাও বেশি এই বছরে। ৫২ হাজার ৫৮৭ আসামির মধ্যে ১৯ হাজার ৫২১ জনের সাজা হয়, যার হার ৪৫ দশমিক ১৮ শতাংশ।
বিচার সম্পন্ন হওয়া ১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৮৫টি মাদক মামলায় মোট আসামি ছিল ২ লাখ ৪৩ হাজার ১৫৮ জন। এর মধ্যে ৯৩ হাজার ৩ জন বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, যা মোট আসামির ৩৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে ১ লাখ ৫০ হাজার ১৫৫ জন খালাস পেয়েছেন, যা ৬১ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
কম সাজা রাজধানীতে
সারাদেশে পুলিশ আটটি মহানগর, আটটি বিভাগীয় রেঞ্জ ও একটি রেলওয়ে রেঞ্জের আওতায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করে। তবে রেলওয়ে রেঞ্জের আওতাধীন থানাগুলোতে মামলার সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় সেটি বাদ দিয়ে ২০২৫ সালে বিচার সম্পন্ন হওয়া মাদক মামলা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গত বছর মাদক মামলায় সাজার হারের দিক থেকে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে ছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। বিচার সম্পন্ন হওয়া মামলার মধ্যে সাজার হার সবচেয়ে কম পুলিশের এই ইউনিটে, মাত্র ১৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ৮৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ মামলায় আসামিরা মুক্তি পেয়েছেন। সর্বোচ্চ সাজার হার চট্টগ্রাম রেঞ্জে; ৬৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
আলাদা তদন্ত সেল প্রয়োজন
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, মাদক মামলায় বেশির ভাগ খালাস হওয়ার কারণ সাক্ষী আসেন না। অনেক সময় সরকারি সাক্ষী বদলি হয়ে যান। একই কর্মকর্তাকে তদন্ত, থানার নিয়মিত ডিউটি, অভিযানসহ নানা কাজ সামলাতে হয়। ফলে অনেক সময় সাক্ষ্য দিতে আসতে পারেন না। তাই মাদক মামলার আলাদা তদন্ত সেল গঠন করা প্রয়োজন। এই সেলের কাজ হবে শুধু মাদক মামলার তদন্ত ও আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া নিশ্চিত করা।
মামলার প্রাণ হলো তদন্ত
সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ বলেন, মামলার প্রাণ হলো তদন্ত। সাক্ষীও গুরুত্বপূর্ণ। তদন্ত সঠিক এবং সাক্ষী যথাসময়ে হাজির হতে হবে। তাহলে মামলার সাজা নিশ্চিত হবে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য তারিখ পেছায়; সাক্ষী আসেন না। এসব কারণে অভিযুক্তরা খালাস হয়ে যান।
সুবিধাভোগীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সমকালকে বলেন, বাংলাদেশে মাদকের সরবরাহ, মাদকাসক্ত ব্যক্তি এবং মাদক বাণিজ্যে সম্পৃক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
মাদক মামলার বিচার হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এর পরও অল্পসংখ্যক মামলার বিচার সম্পন্ন হয়। আবার এসব বিচারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের মাদক বিক্রেতাদের শাস্তি হয়। মূল পৃষ্ঠপোষক বা সুবিধাভোগীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন।
মাদক নিয়ন্ত্রণ বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ
ডিএনসির মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ একটি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সরবরাহ ও চাহিদা কমানো উভয় দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি তরুণ সমাজকে মাদকের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন করা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডিএনসি তদন্তের মান উন্নয়ন, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ, ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রসিকিউশনের সঙ্গে অধিক সমন্বয়ের মাধ্যমে মামলার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে, যাতে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আদালতে শক্তিশালী মামলা উপস্থাপন করা যায়।