ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ঘুষ

অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা ঘুষ
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৯:৪৭ | আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬ | ১১:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ঘুষ-দুর্নীতিতে শীর্ষে অবস্থান করছে পাসপোর্ট ও বিআরটিএ খাত। 

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এর ফলাফল প্রকাশ করে টিআইবি। জরিপে ঘুষ ও দুর্নীতি– পৃথক দুই ক্যাটেগরিতে সেবাগ্রহীতাদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। টিআইবির গবেষক শাহজাদা এম আকরাম ও নুরুজ্জামান ফরহাদ জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন।

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ঘুষ লেনদেনে ১৭টি সেবা খাতের পর্যায়ক্রম হলো–  পাসপোর্ট, বিআরটিএ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, ভূমি, বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা, শিক্ষা (সরকারি ও এমপিওভুক্ত), স্বাস্থ্য (সরকারি), স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহায়তা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, কর ও শুল্ক, বীমা, ব্যাংকিং (সরকারি ও বেসরকারি), এনজিও, (প্রধানত ক্ষুদ্র ও মাঝারি)।

দুর্নীতির শিকার খাতগুলোর পর্যায়ক্রম হলো– পাসপোর্ট, বিআরটিএ, বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, ভূমি, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, জাতীয় পরিচয়পত্র, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহায়তা, বিদ্যুৎ, বীমা, গ্যাস, ব্যাংকিং, এনজিও, কর ও শুল্ক।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নমুনাকাঠামো ব্যবহার করে দেশের আটটি বিভাগের গ্রাম ও শহরাঞ্চল থেকে দুই ধাপে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ১ হাজার ১৪৯টি এলাকা নির্বাচন করে এই জরিপ করেছে টিআইবি। জরিপে সুনির্দিষ্ট ১৭টি সেবা খাতের চিত্র উঠে এসেছে। এর আগে ২০২৩ সালে এই জরিপ করেছিল টিআইবি। ২০২৩ সালে জাতীয় পর্যায়ে ঘুষের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭২৯ কোটি ৯ লাখ টাকা। 
বর্তমান জরিপের ফলাফল বলছে, ২০২৩ সালের মতো ২০২৫ সালেও পাসপোর্ট (৭৬.৬ শতাংশ) ও বিআরটিএ (৬৩.৫) থেকে সেবা নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। 
তবে সার্বিকভাবে পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। গত বছরে খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ৫ হাজার ১২৪ টাকা।

টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে দেশের সেবাগ্রহীতাদের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনো খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। ২০২৩ সালের জরিপে এই হার ছিল ৭০ দশমিক ৯। এইকভাবে ২০২৩ সালে ঘুষের শিকার হয় ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ। ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশে। ২০২৩ সালে ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ কৃষক দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালে এই হার ৬৪ দশমিক ৪। একইভাবে ২০২৩ সালে কৃষকের ঘুষের শিকার হওয়ার হার  ৭ দশমিক ১ শতাংশ। আর ২০২৫ সালে সেটি হয়েছে ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের জরিপে ব্যাংকিং খাতে গড় ঘুষের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৬৮১ টাকা। ২০২৫ সালে সেটি হয়েছে ১৯ হাজার ৩২২ টাকা। একইভাবে শিক্ষায় ৭১১ টাকার জায়গায় ঘুষ দিতে হয়েছে ১ হাজার ৪৯ টাকা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ক্ষেত্রে ৫ হাজার ২২১ টাকা থেকে হয়েছে ৭ হাজার ৪০৭ টাকা।
 স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ৮৮৪ টাকা থেকে হয়েছে ৯২৩ টাকা। 

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘যারা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের মধ্যে অনেকে বলেছেন, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না। ঘুষকে একটি বাস্তবতায় পরিণত করা হয়েছে। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের জরিপে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা আরও বেড়েছে।’

দুর্নীতির কারণে তৈরি হওয়া বৈষম্য ও প্রান্তিক মানুষের ভোগান্তি নিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সেবা খাতের দুর্নীতি বৈষম্যমূলক। যারা ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন, তারা লাভবান হন; আর যাদের হাতে ক্ষমতা নেই, তারা বঞ্চিত হন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ কমপক্ষে একটি খাতে দুর্নীতির শিকার হন। গ্রামাঞ্চলে এই হার ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ। আর শহর এলাকায় ৭৮ শতাংশ। পাসপোর্ট সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার হন ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ। বিআরটিএতে এ হার ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশ। বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা খাতে ৭১ দশমিক ৩ শতাংশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ক্ষেত্রে ৬৯ দশমিক ৪ শতাংশ। জরিপের ১৭টির মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত হয় কর ও শুল্ক। এই খাতে দুর্নীতির শিকার ১১ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ। 
টিআইবির জরিপে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ঘুষ লেনদেন হওয়া ১৩টি খাতের মধ্যে শীর্ষে বিচার সংশ্লিষ্ট সেবা। এ খাতে খানাপ্রতি গড়ে ২৪ হাজার ৬৯১ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। 

দুর্নীতির শিকারে শীর্ষে ময়মনসিংহ, খুলনা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয়ভাবে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ দুর্নীতি এবং ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ ঘুষের শিকার হন। ময়মনসিংহ বিভাগে ৮৮ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ দুর্নীতি এবং ৬৬ দশমিক ৬ শতাংশ ঘুষের শিকার হন। খুলনা বিভাগে ৮৮ শতাংশ মানুষ দুর্নীতি এবং ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশ ঘুষের শিকার হন। বরিশাল বিভাগে ৮৭ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ দুর্নীতি এবং ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ ঘুষের শিকার হন। রংপুর বিভাগে ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দুর্নীতি এবং ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ ঘুষের শিকার হন। 

ঢাকা বিভাগে ৮০ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ দুর্নীতি এবং ৬৩ দশমিক ৯ শতাংশ ঘুষের শিকার। চট্টগ্রাম বিভাগে ৭৯ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ দুর্নীতি এবং ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ ঘুষের শিকার। 

সিলেট বিভাগে ৭৯.৩ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ দুর্নীতি এবং ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ ঘুষের শিকার। রাজশাহী বিভাগে ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ দুর্নীতি এবং ৫৮ দশমিক ৮ শতাংশ ঘুষের শিকার।
 
ঘুষ দেওয়ার কারণ 
ঘুষ দেওয়ার কারণ হিসেবে জরিপে বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে। ৯৮ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ বাধ্য হয়ে ঘুষ দেন। ২৩ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ যোগসাজশের মাধ্যমে ঘুষ লেনদেন করেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক ব্যক্তি বা জনপ্রতিনিধি, দালাল, সেবাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে ঘুষ লেনদেন হয়। দুর্নীতির শিকার হয়েও অনেকে অভিযোগ দিতে চান না। কারণ হিসেবে অনেকেই প্রয়োজন মনে করেন না। অনেকে জানেন না কোথায় অভিযোগ দিতে হবে। কেউ কেউ মনে করেন অভিযোগ দিলে কাজ হবে না বরং ঝামেলায় পড়ার শঙ্কা আছে। 

টিআইবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১৯৯৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ১১টি খানা জরিপ পরিচালনা করেছে সংস্থাটি। সর্বশেষ জরিপের তথ্য সংগ্রহের সময় ছিল ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে সেবা খাতে দুর্নীতিবিষয়ক তথ্যের বিবেচ্য সময় ছিল ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত। দৈবচয়নের মাধ্যমে আট বিভাগের ১৫ হাজার ৭১৫ জনের ওপর জরিপটি পরিচালিত হয়। এ মধ্যে গ্রামাঞ্চলের মানুষ ছিল ৭ হাজার ৯০৪ জন। শহরের বাসিন্দা ছিলেন ৭ হাজার ৮১১। কৃষক, ব্যবসায়ী, ক্ষেতমজুর, বেসরকারি-সরকারি চাকরিজীবী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, শিক্ষক, জেলে, কামার-কুমারসহ প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষই এ জরিপে অংশ নিয়েছেন। হিন্দু-মুসলিম, নারী-পুরুষ, ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীও ছিল জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে। অশিক্ষিত, স্বশিক্ষিত, শিক্ষিত, উচ্চশিক্ষিতরাও বাদ যাননি। জরিপ পরিচালনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ হয়েছে বলে জানিয়েছে টিআইবি। 

সার্বিক পর্যবেক্ষণে টিআইবি বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবায় দুর্নীতি ও ঘুষের উচ্চহার অব্যাহত রয়েছে, যা সাধারণ জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা। এসব দুর্নীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিক সেবাপ্রাপ্তির অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করছে। 

টিআইবির সুপারিশ
টিআইবির মতে, সেবা খাতে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিলে দুর্নীতি কমতে পারে। পাশাপাশি অনলাইন বা ডিজিটাল সেবা বৃদ্ধি, মানুষের মধ্যে ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানোর উদ্যোগ, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুগোপযোগী করা ও গণশুনানির আয়োজন করলে সুফল পাওয়া যেতে পারে। 

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা হিসাব করেছি, সেবা খাতে দুর্নীতির কারণে প্রায় ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের প্রায় ১ দশমিক ৫৮ শতাংশের সমান। এটি যেমন একটি বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি, তেমনই দরিদ্র, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বেশি।’

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অকার্যকারিতা ও জনগণের আস্থার সংকট নিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু আমাদের জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা বলছে, শাস্তির নিশ্চয়তা না থাকায় দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ২৬ শতাংশ দুদক সম্পর্কে জানেন বা পরিচিত।’

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এমন এক সময়ে আমরা এই প্রতিবেদন প্রকাশ করছি, যখন দুর্নীতি দমন কমিশন বাস্তবে স্থবির। কারণ গত তিন থেকে সাড়ে তিন মাস ধরে কমিশন নেই। আমরা আবারও সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, সার্চ কমিটির কার্যক্রম সম্পন্ন করে পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুদকে এমন নেতৃত্ব দেওয়া হোক, যাতে মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়। এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে, যাদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সততা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান রয়েছে; যারা আইনের দৃষ্টিতে সবাইকে সমানভাবে বিবেচনা করে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। আমরা আশা করি, দুর্নীতি দমন কমিশনে এমন ব্যক্তিদেরই নিয়োগ দেওয়া হবে।’

 

আরও পড়ুন

×