ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

এইচপিভি প্রতিরোধে টিকাদান ও সচেতনতা জোরদারের আহ্বান

১১ থেকে ২১ বছর বয়সী ছেলে ও মেয়েদের টিকার আওতায় আনার দাবি

এইচপিভি প্রতিরোধে টিকাদান ও সচেতনতা জোরদারের আহ্বান
×

ছবি-সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ১৯:২৮ | আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬ | ১৯:৫৬

দেশে এইচপিভি (হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস) সংক্রান্ত রোগ প্রতিরোধে টিকাদান, সচেতনতা ও সময়মতো স্ক্রিনিং কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, এইচপিভি শুধু জরায়ুমুখের ক্যান্সার জন্য দায়ী নয়, এটি নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার ঝুঁকি তৈরি করে। তবে কার্যকর টিকাদান, জনসচেতনতা এবং সঠিক সময়ে পরীক্ষা নিশ্চিত করা গেলে জরায়ুমুখের ক্যানসার নির্মূল করা সম্ভব।

সোমবার শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ইন্টারন্যাশনাল প্যাপিলোমাভাইরাস সোসাইটি (আইপিভিএস) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে মূল্য প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইপিভিএস বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের লিড অধ্যাপক ডা. আশরাফুন্নেছা। তিনি বলেন, এইচপিভি সবচেয়ে সাধারণ যৌনবাহিত সংক্রমণগুলোর একটি। এর ২০০টিরও বেশি ধরন রয়েছে, যার মধ্যে ১৪টি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংক্রমণ দুই বছরের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে সেরে গেলেও দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ ক্যান্সার কারণ হতে পারে। উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এইচপিভি-১৬ ও এইচপিভি-১৮ স্টেইন জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী। এ ছাড়া পায়ুপথ, মুখগহ্বর, যোনিপথ ও পুরুষাঙ্গের ক্যানসারের সঙ্গেও এই ভাইরাসের সম্পর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি জানান, দেশে সাধারণ নারীদের মধ্যে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এইচপিভির প্রাদুর্ভাব ৪ দশমিক ২ শতাংশ। উপকূলীয় অঞ্চলে এ হার ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় শহর ও গ্রামের নারীদের মধ্যে এ হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ পাওয়া গেছে।

জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সরকারের জাতীয় কৌশলের বিষয়েও তিনি কথা বলেন। তিনি জানান, স্কুলে পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং কমিউনিটির ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেয়েদের একক ডোজ এইচপিভি টিকা দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ টিকাদান কর্মসূচির আওতা ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। বর্তমানে দেশে ৬০১টি ভিজ্যুয়াল ইনস্পেকশন উইথ অ্যাসিটিক অ্যাসিড (ভিআইএ) কেন্দ্র এবং ৫২টি কল্পোস্কোপি ক্লিনিক রয়েছে বলেও তিনি জানান।

আইপিভিএস বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের লিড অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহার বলেন, তাঁদের লক্ষ্য এইচপিভি-সংক্রান্ত রোগমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এ জন্য টিকাদান, স্ক্রিনিং, গবেষণা, তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নীতি ও অংশীজনদের সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করা হবে। তিনি জানান, চ্যাপ্টারের কার্যক্রম ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া হবে। 

বাংলাদেশ গাইনিকোলজিক্যাল অনকোলজি সোসাইটি (জিওএসবি) সভাপতি অধ্যাপক সাবেরা খাতুন বলেন, জরায়ুমুখের ক্যানসারের সঙ্গে এইচপিভির সম্পর্ক আবিষ্কারের পর থেকেই এ ভাইরাস প্রতিরোধে টিকার গুরুত্ব বেড়ে যায়। বাংলাদেশেও এইচপিভি টিকা নিয়ে গবেষণার কাজ অনেক আগে শুরু হয়েছিল। এখন আমাদের দুইটা দাবি কিশোর কিশোরীদের টিকার আওতায় আনা। দুই ডিএনএভিত্তিক পরীক্ষা এবং সেলফ-টেস্টিং পদ্ধতি চালুর ব্যবস্থা করা।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসী কাদরী বলেন, বর্তমানে কেবল নির্দিষ্ট বয়সী মেয়েদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। তিনি ১১ থেকে ২১ বছর বয়সী কিশোরী ও তরুণীদের পাশাপাশি ছেলেদেরও টিকার আওতায় আনার বিষয়ে বিবেচনার আহ্বান জানান। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৯ হাজার নারী জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় প্রায় অর্ধেকের মৃত্যু হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘৯০-৭০-৯০’লক্ষ্যমাত্রা অর্জন জরুরি।

জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) নির্মূলের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ‘৯০-৭০-৯০’ কৌশল বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. কাজী আহম্মেদ জাকী। তিনি বলেন, এ কৌশলের আওতায় ৯০ শতাংশ টিকাদান, ৭০ শতাংশ স্ক্রিনিং এবং ৯০ শতাংশ চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে আইইডিসিআর সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। 

বিএমইউর সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, লক্ষ্য বা ‘ভিশন’ ঠিক থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো উন্নত হলেও সেবার মান এখনও অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। বাস্তব সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু নীতিগত আলোচনা নয়, মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নেও গুরুত্ব দিতে হবে। 

বিএমইউর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, বাংলাদেশে গত ২ বছরে প্রায় ১৮ হাজার এইচপিভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে গত দুই বছরেই শনাক্ত হয়েছে প্রায় ৪ হাজার রোগী। আক্রান্তদের মধ্যে অনেকের বয়স কম এবং অনেকে অবিবাহিত হওয়ায় বিষয়টি উদ্বেগজনক।

অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা বলেন, আইপিভিএস বিশ্বজুড়ে প্যাপিলোমাভাইরাসজনিত রোগ প্রতিরোধে কাজ করছে। বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের গবেষক, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এ প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

আরও পড়ুন

×