ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে উত্তরে বাড়ছে পানি

কুড়িগ্রামে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে

উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে উত্তরে বাড়ছে পানি
×

দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ছবি: ফোকাস বাংলা

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ২০:১৩

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা ভারী বৃষ্টিতে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, জিঞ্জিরাম ও অর্জুনডারাসহ জেলার ৩২টি নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এর মধ্যে দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মঙ্গলবার দুপুর ৩টার তথ্য জানিয়ে বলেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে ৫৯ সেন্টিমিটার, তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ৭২ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৩৫ সেন্টিমিটার এবং নুনখাওয়া পয়েন্টে ৫১ সেন্টিমিটার বেড়েছে। একই সময়ে দুধকুমার নদের পানি ৫৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এদিকে নাগেশ্বরী উপজেলার দুধকুমার নদের মুড়িয়ারহাট এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে এবং কিছু স্থানে বাঁধের ওপর দিয়ে পানি উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। এতে বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মালিয়ানী, তেলিয়ানীপাড়া, বড়মানী, মিয়াপাড়া, সেনপাড়া, পাটেশ্বরী, বোয়ালের ডারা, ধনিটারীসহ অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা বকুল মিয়া বলেন, নদের পাড়ের নিচু জায়গায় বালু তুলে রাখায় পানি উপচে বাড়িঘরে ঢুকছে। আরেক বাসিন্দা আতিকুর ইসলাম বলেন, পানি বাড়ছে। আমার দুই বিঘা সবজি ক্ষেত পুরো ডুবে গেছে।

জেলা কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র জানান, সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত জেলায় ১৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ভারী বৃষ্টির কারণেই জেলার সব নদ-নদীর পানি বেড়েছে।

কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জেলার সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুধকুমার নদের পানি ইতিমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। পানি বাড়তে থাকলে জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

তিনি বলেন, দুধকুমার নদের পাড়ে একটি নিচু অংশ দিয়ে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। সেখানে জিও ব্যাগ ফেলে পানি ঠেকানোর চেষ্টা করা হবে। তিনি জানান, জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে মুড়িয়ারহাট এলাকায় প্রায় ৩০০ মিটার অংশে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ওই অংশ দিয়েই পানি ঢুকেছে।

নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম খোদাদাদ হোসেন বলেন, বাঁধ ভাঙার বিষয়টি জানার পর পাউবোকে অবহিত করা হয়েছে। তারা ভাঙনকবলিত স্থান মেরামতের কাজ শুরু করেছে। প্রশাসন পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে।

অন্যদিকে উজানে ভারতের আসাম ও অরুণাচল প্রদেশে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তার পানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। রোববার রাত ১১টায় লালমনিরহাটের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে তিস্তা ব্যারাজের ভাটির চারটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয় এবং ফসলি জমি তলিয়ে যায়। পরে সোমবার সকাল থেকে পানি কমতে শুরু করে এবং বিকেলে বিপৎসীমার ১৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ড, লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার রায় বলেন, উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তিস্তা তীরবর্তী বেশ কয়েকটি এলাকা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। জেলার পাঁচটি উপজেলার জন্য ২২০ মেট্রিক টন চাল এবং ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে এবং কুড়িগ্রামের দুধকুমার অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া আগামী কয়েক দিনে সিলেট, সুনামগঞ্জ, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণার কয়েকটি নদ-নদীর পানিও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। আগামী ২ থেকে ৪ জুলাইয়ের মধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়া জেলায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবীর বলেন, আজ মঙ্গলবার থেকে দেশের উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টি বাড়তে পারে এবং এ বৃষ্টিপাত টানা তিন থেকে চার দিন অব্যাহত থাকতে পারে। তাঁর মতে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হলে বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে, যা উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট প্রতিনিধি]

আরও পড়ুন

×