দলগুলোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি’: আনু মুহাম্মদ
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ২১:১৩
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে ‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি’ আখ্যা দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেছেন, নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, অঙ্গীকার করে, সেগুলো রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি বা প্রতারণা। এগুলো বললে তারা একটু হাসবে হয়তো। কারণ, এগুলো তাদের অভ্যাস। এই ধোঁকাবাজি তাদের রাজনীতিরই অংশ।
সোমবার ‘রাষ্ট্রীয় মালিকানায় পাটকল চালুর দাবিতে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ হলে এই সভার আয়োজন করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রক্ষা পরিষদ।
আনু মুহাম্মদ বলেন, এমনিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মিল নেই, একজন আরেকজনকে দেখতে পারে না। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো বন্ধ করা বা বেসরকারীকরণের মতো নীতিগুলোর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পার্থক্য পাওয়া যায় না।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরের ধারা আশির দশক থেকেই চলছে উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে দলগুলো বন্ধ কলকারখানা চালু করার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু তারা নিজেরাও জানে যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এগুলো তারা চালু করবে পারবে না। এর পেছনে একই কাঠামো বারবার কাজ করে। আন্তর্জাতিক সংস্থা, আমলাতন্ত্র ও বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী– এরাই নীতি প্রণয়ন করে।
তিনি বলেন, নীতি প্রণয়নকারীদের কোনো পরিবর্তন হয় না। পরিবর্তন হয় শুধু বাস্তবায়নকারীদের চেহারার। এ কারণেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলেও রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল চালুর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয় না। কিন্তু বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পাটকল শ্রমিকরা। শ্রমিকদের শ্রমের প্রাপ্য মজুরি পরিশোধ করা কঠিন কোনো বিষয় ছিল না। কিন্তু তা পরিশোধ করা হয়নি।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য আনু মুহাম্মদ বলেন, পাটকল বেসরকারীকরণের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়, পাটের চাহিদা নেই, লোকসান হচ্ছে কিংবা পাটকল চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এসব যুক্তিও প্রতারণা, ধোঁকাবাজি বা মিথ্যাচার। পাটশিল্পের অমিত সম্ভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করা, তাকে কাজে লাগানো কিংবা এই খাতে দুর্নীতি হলে সেটা দূর করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেটা না করে বেসরকারি খাতে দিয়ে লুটপাটের সুযোগ করে দেওয়া আরেকটি দুর্নীতি।
মতবিনিময় সভায় উন্নয়ন অর্থনীতিবিষয়ক গবেষক ও লেখক ড. মাহা মির্জা বলেন, শ্রমিক কল্যাণ, কর্মসংস্থান ও দেশীয় শিল্প রক্ষার ব্যাপারে সব সরকার একইভাবে চিন্তা করে। তারা মুখে বড় বড় কথা বলে, উন্নয়নের কথা বলে, কিন্তু শ্রমিকের ক্ষেত্রে তাদের চিন্তা-চেতনার জায়গাটা একই। শ্রমিকের লেন্স থেকে কখনও তারা চিন্তা করতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, সরকারগুলোর প্রতিশ্রুতির অভাব নেই। কিন্তু কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো নিশ্চয়তা তাদের কাছে নেই।
জাতীয় শ্রমিক-কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি আ ক ম জহিরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং শ্রমিক নেতা সত্যজিৎ বিশ্বাসের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সমন্বয়ক ফয়জুল হাকিম, জাতীয় গণফ্রন্টের প্রধান সমন্বয়কারী টিপু বিশ্বাস, শ্রমিক-কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক শামীম ইমাম, শ্রমজীবী ও হকার সমিতির সভাপতি বাচ্চু ভূঁইয়া প্রমুখ।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে বক্তব্য দেন খুলনার পাটকল শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক আল আমিন, লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসের সিরাজুল ইসলাম, প্লাটিনাম জুট মিলসের নুর ইসলাম, জে জে আই জুট মিলসের শ্যামল শাফরিন, দৌলতপুর জুট মিলসের নুর মোহাম্মদ, আমিন জুট মিলসের মো. হানিফ, করিম জুট মিলসের গোফরান মিয়া প্রমুখ।
বক্তারা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরের উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বর্তমান সরকারও নির্বাচনী ইশতেহারে পাটকল ও চিনিকল পুনরায় চালুর লক্ষ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর পাট ও বস্ত্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেননি। টাস্কফোর্স গঠন না করেই ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলসহ মোট ৪৪টি শিল্পকারখানা ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৪টি পাটকল ৩০ বছরের জন্য লিজ বা ইজারা দেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- আনু মুহাম্মদ
- রাজনীতি
