ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

ঘরে বসেই রিটার্ন, ডিজিটাল কর ব্যবস্থায় বাড়ছে আস্থা

কমেছে ভোগান্তি

ঘরে বসেই রিটার্ন, ডিজিটাল কর ব্যবস্থায় বাড়ছে আস্থা
×

ছবি: সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ১৯:৫৯

এক সময় আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া মানেই ছিল কর অফিসে দীর্ঘ লাইন, কাগজপত্রের ঝামেলা এবং দিনের পর দিন অপেক্ষা। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলেছে। করদাতারা ঘরে বসেই মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে কয়েক মিনিটে রিটার্ন দাখিল করতে পারছেন। সঙ্গে সঙ্গে মিলছে রিটার্ন গ্রহণের প্রাপ্তিস্বীকার ও কর সনদ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ করবর্ষ থেকে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়। ২০২৬ সালে ই-রিটার্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে ৫০ লাখের বেশি রিটার্ন জমা পড়েছে, যার বিপরীতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার কর আদায়ের তথ্য জানিয়েছে এনবিআর।

বাংলাদেশে কর প্রশাসন ডিজিটাল করার উদ্যোগ নতুন নয়। গত এক দশকে বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা হলেও প্রত্যাশিত ফল মেলেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় কর কাঠামো, প্রশাসনিক বাস্তবতা ও ব্যবহারকারীর প্রয়োজনের সঙ্গে সেসব ব্যবস্থা পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সিনেসিস আইটি ই-রিটার্ন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে, যা বর্তমানে এনবিআরের অনলাইন রিটার্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এনবিআরের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অতীতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর প্রশাসন আধুনিকায়নের বিভিন্ন উদ্যোগে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে। তার ভাষায়, অনলাইন ব্যবস্থায় তথ্য সংরক্ষিত থাকায় ফাইল হারিয়ে যাওয়া বা পরিবর্তনের সুযোগ কমেছে এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতাও বেড়েছে।

প্ল্যাটফর্মটিতে বৈধ টিআইএন ও নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর দিয়ে লগইন করে আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ ও দায়-দেনাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য ধাপে ধাপে যুক্ত করা যায়। মোবাইল ফোন থেকেও রিটার্ন জমা দেওয়া সম্ভব। কর মৌসুমে বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারী একসঙ্গে প্রবেশ করলেও সিস্টেম সচল রাখতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পরিসংখ্যানেও অনলাইন সেবার ব্যবহার বাড়ার চিত্র দেখা যাচ্ছে। ২০২৩-২৪ করবর্ষে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করেছিলেন ৫ লাখ ২৭ হাজার করদাতা। পরের করবর্ষে তা বেড়ে ১৭ লাখ ১২ হাজারে পৌঁছায়। বর্তমানে নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশ ডেলিগেশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার কিশোয়ার আমিন বলেন, অনলাইন ই-রিটার্ন ব্যবস্থা কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি কর ফাঁকি কমিয়ে রাজস্ব আদায়ে সহায়ক হবে। তিনি জানান, নতুন একটি প্রকল্পের আওতায় ভবিষ্যতে কর্পোরেট রিটার্নও অনলাইনে আনা এবং কর ব্যবস্থার আরও ডিজিটাল রূপান্তরে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর অধ্যাপক খালেদ মাহমুদ মনে করেন, দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমাধান তৈরি করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছে। এতে ব্যবহারকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত পরিবর্তন ও সেবা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সিনেসিস আইটির চিফ সলিউশন অফিসার আমিনুল বারি শুভ্র বলেন, জাতীয় পর্যায়ের ডিজিটাল সেবায় ডেটার নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং স্থানীয় বাস্তবতা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, ই-রিটার্ন প্ল্যাটফর্মের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বড় পরিসরের সরকারি ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, আয়কর আইন-২০২৩ অনুসারে বর্তমানে ৪৩ ধরনের সেবা পেতে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয়। ফলে ই-রিটার্ন ব্যবস্থা এখন শুধু কর আদায়ের একটি মাধ্যম নয়, বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক সেবারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। আগামীতে কর্পোরেট রিটার্ন, ডিজিটাল অডিট ও স্মার্ট অফিস ব্যবস্থাপনা যুক্ত হলে দেশের কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর আরও বিস্তৃত হবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশা।
 

আরও পড়ুন

×