ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

হৃদরোগের চিকিৎসা

পেসমেকারসহ তিন ধরনের সরঞ্জামের দাম কমলো

পেসমেকারসহ তিন ধরনের সরঞ্জামের দাম কমলো
×

 তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৫ | আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত পেসমেকার, ইমপ্লান্টেবল কার্ডিওভার্টার ডিফিব্রিলেটর (আইসিডি) এবং কার্ডিয়াক রিসিঙ্ক্রোনাইজেশন থেরাপি (সিআরটি) ডিভাইসের দাম কমানো হয়েছে। এসব উপকরণের মূল্য সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ দুই লাখ পর্যন্ত কমানো হয়েছে। উপকরণভেদে সর্বোচ্চ প্রায় ২৯ শতাংশ পর্যন্ত দাম কমেছে। 

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের গত এপ্রিলে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ মূল্য নির্ধারণ করা হয়। নতুন আমদানি করা উপকরণের ক্ষেত্রে এই মূল্য কার্যকর হবে। আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নীতিমালার বাইরে গিয়ে আমদানিকারকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানের মুখে পড়বে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের স্মারকের ভিত্তিতে সরকারিভাবে গঠিত বিশেষজ্ঞ প্যানেল ও পরামর্শক কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে নিবন্ধিত ও আমদানিকৃত হৃদরোগ চিকিৎসা উপকরণের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে একাধিকবার এ বিষয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জন, কার্ডিওলজিস্ট, মেডিকেল ডিভাইস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া হয়।

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা জানান, পেসমেকার, আইসিডি এবং সিআরটি হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা উপকরণ। পেসমেকার মূলত রোগীর হৃৎস্পন্দন খুব ধীর বা অনিয়মিত হয়ে গেলে তা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, আইসিডি হৃৎস্পন্দনের বিপজ্জনক অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করে এবং প্রয়োজন হলে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। আর সিআরটি এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি, যা হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন অংশের স্পন্দনের সময়ের অসামঞ্জস্য দূর করে হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা উন্নত করতে সহায়তা করে। সাধারণত হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা বা হার্ট ফেইলিউরের কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হয়। 

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ইমপ্লান্টেবল কার্ডিওভার্টার ডিফিব্রিলেটর (সিডিভিআরএ৬০০০ নিউট্রিনো ভিআর)-এর মূল্য সাত লাখ টাকা থেকে কমিয়ে পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল্য কমেছে ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

ইমপ্লান্টেবল কার্ডিওভার্টার ডিফিব্রিলেটর (সিডিভিআরএ৫০০কিউ গ্যালান্ট ভিআর)-এর মূল্য ছয় লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, কমেছে ২৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। এ ছাড়া ইমপ্লান্টেবল কার্ডিওভার্টার ডিফিব্রিলেটর (সিডিডিআরএ৫০০কিউ গ্যালান্ট ডিআর)-এর মূল্য ৯ লাখ টাকা থেকে আট লাখ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইমপ্লান্টেবল কার্ডিওভার্টার ডিফিব্রিলেটর (সিডিএইচএফএ৬০০কিউ নিউট্রিনো এইচএফ)-এর মূল্য ১২ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে (সিডিএইচএফএ৫০০কিউ গ্যালান্ট এইচএফ)-এর মূল্য ১২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে।

এনডিউরিটি কোর ডিডিডিআর পেসমেকার (ডুয়াল চেম্বার)-এর মূল্য দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এনডিউরিটি এমআরআই ডিডিডিআর পেসমেকারের মূল্য দুই লাখ ৮০ হাজার থেকে কমিয়ে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অ্যাসিউরিটি এমআরআই ডিআর ডিডিডিআর পেসমেকারের মূল্য তিন লাখ ৩৫ হাজার থেকে কমিয়ে তিন লাখ টাকা করা হয়েছে। এনডিউরিটি কোর ভিভিআইআর পেসমেকার (সিঙ্গেল চেম্বার)-এর মূল্য এক লাখ ৪৫ হাজার থেকে কমিয়ে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, কার্ডিয়াক রিসিঙ্ক্রোনাইজেশন থেরাপি (সিআরটি) ডিভাইসটির মূল্য সামান্য বেড়েছে। এর পূর্বমূল্য ছিল পাঁচ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, যা পুনর্নির্ধারণ করে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া এসজেএম পিল-অ্যাওয়ে ইন্ট্রোডিউসারের মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এর আগের মূল্য এবং নতুন মূল্য চার হাজার টাকা।

মন্ত্রণালয়ের শর্ত
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি মেডিকেল ডিভাইসের মোড়কে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য, উৎপত্তির দেশ, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং ডিএআর নম্বর সিলমোহর আকারে উল্লেখ করতে হবে। এ ছাড়া ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে মেডিকেল ডিভাইস আমদানি ও বাজারজাত করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এর আগে ২০১৭ সালে সরকার এসব হৃদরোগ চিকিৎসা উপকরণের দাম নির্ধারণ করেছিল। এর আগে নির্ধারিত মূল্য না থাকায় বিভিন্ন হাসপাতালে পেসমেকার ও হার্টের ভালভ বিভিন্ন দামে বিক্রি হতো। এ নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়।

রোগীদের অভিযোগ, এসব চিকিৎসা উপকরণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় বিভিন্ন হাসপাতাল ভিন্ন ভিন্ন ব্র্যান্ডের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করত। নতুন মূল্য নির্ধারণের ফলে এখন সবাই একই দামে বিক্রি করতে বাধ্য থাকবে বলে তারা মনে করছেন। দেশে হৃদরোগ চিকিৎসায় এসব উপকরণের ব্যবহার শুরু হয় ১৯৯২-৯৩ সালে। পরে ২০১৫ সালে এ বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়।
বর্তমানে হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত পেসমেকার, ইমপ্ল্যান্টেবল কার্ডিওভার্টার ডিফিব্রিলেটর এবং কার্ডিয়াক রিসিঙ্ক্রোনাইজেশন থেরাপি ডিভাইস উৎপাদন করে মূলত তিনটি প্রতিষ্ঠান। সেগুলো হলো অ্যাব্যাট, মেডট্রনিক ও বোস্টন সায়েন্টিফিক। দেশীয় আমদানিকারকদের মধ্যে রয়েছে দ্য স্পন্দন লিমিটেড, মেডট্রনিক ও কার্ডিয়াক কেয়ার। বাংলাদেশে পেসমেকারের বাজারের বার্ষিক আকার প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান বলেন, হার্টের রিংয়ের মূল্য নির্ধারণের পর পেসমেকারসহ অন্যান্য হৃদরোগ চিকিৎসা উপকরণের দামও কমানো হয়েছে। এতে মূল্য তুলনামূলক সহনীয় পর্যায়ে এসেছে। এখন নিউরো, অর্থোপেডিক্স চক্ষুসহ অন্যান্য চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট ডিভাইসের দামও কমানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তবে দ্য স্পন্দন লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, নীতিমালার বাইরে গিয়ে আমদানিকারকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন মূল্য নির্ধারণের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, নীতিমালা অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ হলে ব্যবসা পরিচালনায় সমস্যা হতো না।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আকতার হোসেন বলেন, রোগীদের স্বার্থে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। করোনারি ও নিউরোলজিক্যাল স্টেন্টবিষয়ক পরামর্শক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে অন্যান্য দেশের বাজারদর পর্যালোচনা করেই এ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে এসব চিকিৎসা উপকরণের দাম এখনও বেশি বলে জানান তিনি।

 

আরও পড়ুন

×