বর্ষায় কমছে বৃষ্টি, বাড়ছে গরম
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩২ | আপডেট: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
আষাঢ়ের প্রথম দিন ছিল গত ১৫ জুন। কিন্তু বর্ষার প্রথম ১৬ দিনই দেখা গেছে উল্টো চিত্র। অধিকাংশ এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টি কম হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বয়ে গেছে তাপপ্রবাহ। আবহাওয়া অধিদপ্তর, আবহাওয়াবিদ ও গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের বর্ষার চেনা রূপ বদলে যাচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে জুন মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ ৪৪৫ মিলিমিটার। কিন্তু চলতি বছরের জুনে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৩১২ মিলিমিটার, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ কম।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ ছাড়া দেশের বেশির ভাগ এলাকায় জুন মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল বেশি। একই সময়ে খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকায় তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। তিনি বলেন, আগে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে তাপপ্রবাহ হতো। কিন্তু এখন জুন, জুলাই, এমনকি আগস্ট মাসেও তাপপ্রবাহের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।
চলতি বছরের জুনে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তুলনামূলক বেশি বৃষ্টি হলেও অন্য অনেক এলাকায় বৃষ্টির বড় ঘাটতি দেখা গেছে। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ১১ জুন সারাদেশে বিস্তার লাভ করে। এরপর শুধু ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও চট্টগ্রাম বিভাগে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হয়েছে। জুন মাসে দেশের সর্বোচ্চ দৈনিক বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ১২ জুন নেত্রকোনায়। ওই দিন সেখানে ১৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।
চলতি বছরের জুনে সিলেটে বৃষ্টি হয়েছে ৭৭৮ মিলিমিটার। গত বছর জুন মাসে এটি ছিল দুই হাজার মিলিমিটারের বেশি, যা সেখানের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের প্রায় আড়াই গুণ। জুন মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েক দফা তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। ১ থেকে ৮ জুন, ১৩ থেকে ১৮ জুন এবং ২৫ থেকে ২৯ জুন দেশের অনেক এলাকায় মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ ছিল। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বর্ষাকালের গরম শুষ্ক মৌসুমের গরমের চেয়েও বেশি অস্বস্তিকর। কারণ এ সময় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত থাকে। ফলে শরীরে অনুভূত তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি বেশি লাগে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দেশে মৌসুমি বায়ুর প্রবেশ দেরিতে হয়েছে। সাধারণত মে মাসের শেষ দিকে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল দিয়ে মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করে। কিন্তু এবার তা জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে দেশে প্রবেশ করে। আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবীর বলেন, মৌসুমি বায়ু ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘ সময় আটকে ছিল। ফলে বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ুর স্বাভাবিক সক্রিয়তা তৈরি হতে সময় লেগেছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এ বছর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এল নিনোর প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছে। এল নিনোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কম বৃষ্টি ও বেশি তাপমাত্রার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘১৯৫২ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশে বৃষ্টির প্রবণতা’ শীর্ষক গবেষণায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১২টি স্টেশনের উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে গড় বৃষ্টিপাত যথাক্রমে শূন্য দশমিক ১৬ মিলিমিটার, শূন্য দশমিক ৩ মিলিমিটার এবং শূন্য দশমিক ১০ মিলিমিটার করে কমেছে। গবেষণাটির অন্যতম গবেষক এবং জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এখন টানা বৃষ্টির ঘটনা কমে যাচ্ছে। আবার অল্প সময়ের মধ্যে ভারী বৃষ্টির ঘটনা বাড়ছে। এরপর আবার তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
‘অ্যানালাইসিস অব লং-টার্ম রেইনফল ট্রেন্ডস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় ১৯৮১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশের বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বিভাগ ছাড়া দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার ফলে আবহাওয়ার চরম বৈশিষ্ট্যগুলোর ধরন বদলে যাচ্ছে। স্বাভাবিক ছন্দ পরিবর্তিত হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আট বিভাগেই জুলাই মাসে প্রায় স্বাভাবিক বৃষ্টি হতে পারে। এক থেকে দুই দফা মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে এবং দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকতে পারে। আগামী তিন মাসে বঙ্গোপসাগরে চার থেকে ছয়টি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। যার মধ্যে এক থেকে তিনটি মৌসুমি নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে।
