বুড়িগঙ্গা, তুরাগ শীতলক্ষ্যা ও বালু
চার নদীর সীমানা পিলার স্থাপন ১৭ বছরেও শেষ হয়নি
ছবি: সংগৃহীত
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ১০:২৩
উচ্চ আদালতের এক ঐতিহাসিক রায়ের ১৭ বছর পেরিয়ে জানা গেল– বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীতীরে সীমানা পিলার বসানোর কাজ এখনও শেষ করা যায়নি। এতে নদীগুলো অরক্ষিত হয়ে তীরভূমি আবারও বেদখলে চলে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নেওয়া সেসব প্রকল্পের থমকে থাকা কাজ শেষ করতে এখন নতুন প্রকল্প প্রস্তাবনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।
২০০৯ সালের ২৪ ও ২৫ জুন হাইকোর্ট থেকে ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী চারটি নদীর মূল সীমানা ধরে ১০ হাজার পিলার স্থাপনের জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ওই বছরই গণপূর্ত অধিদপ্তরকে সীমানা পিলার বসাতে বলা হয়। অধিদপ্তর থেকে সংশোধিত জরিপের ভিত্তিতে কিছু পিলার বসানোও হয়েছিল। পরে আইনি জটিলতা ও সমালোচনার মুখে সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়।
এর পর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিআইডব্লিউটিএর দায়িত্বে শুরু হয় চারটি নদীতীরের সীমানা নির্ধারণ এবং নদীর দুই তীরে ২২০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ। সংস্থাটি ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দফায় দফায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে ঢাকা নদীবন্দরের আওতায় ১৭ হাজার ৮২৯টি, নারায়ণগঞ্জে পাঁচ হাজার ৭৯১টি এবং টঙ্গী এলাকায় ২৫০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে। এই সময়ে বিভিন্ন অভিযানে ৫২০ একর, ৩৫০ একর ও ৯ একর নদীতীর উদ্ধার করা হয়।
উচ্ছেদ অভিযানের পাশাপাশি ‘বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর তীরভূমিতে পিলার স্থাপন, তীর রক্ষা, ওয়াকওয়ে, জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় উদ্ধারকৃত নদীতীরে সীমানা পিলার, সুরক্ষা দেয়াল, হাঁটার পথ এবং জেটি নির্মাণের কাজ ধরেছিল বিআইডব্লিউটিএ। ২০১৮ সালে অনুমোদিত প্রকল্পটি তিনটি ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
প্রকল্পের প্রথম ধাপে বছিলা, টঙ্গী, কাঁচপুর ও টানবাজারে সীমানা চিহ্নিতকরণ পিলারসহ ২০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে এখন পর্যন্ত ৫২ কিলোমিটার লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ৪২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া ফতুল্লা, গাবতলী, আমিনবাজার (সাভার প্রান্ত), রায়েরবাজার, কামরাঙ্গীরচর, টঙ্গী ও আশুলিয়ায় সাত হাজার ১০০টি সীমানা পিলারের মধ্যে ছয় হাজার ৩০০টি স্থাপন এবং তিনটি জেটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।
এর মধ্যে প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের ব্যয় ও সময়সীমা দুই দফা সংশোধন করে ৮৪৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ২৭৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ছিল গত বছরের জুন পর্যন্ত। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই সময়ের মধ্যে ব্যয় হয়েছে এক হাজার ২৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে শেষ হয়েছে ৯২ শতাংশ কাজ।
সূত্রমতে, তৃতীয় ধাপে এই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ কেরানীগঞ্জ, পাগলা, বন্দর, ডেমরা, কাঞ্চন, পূর্বাচলসহ বাকি ১৪৮ কিলোমিটার এলাকায় পিলার স্থাপন ও সুরক্ষা দেয়াল নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল বিআইডব্লিউটিএর। এ জন্য ২০২০ সালে বিশ্বব্যাংকের আমব্রেলা ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের অধীনে প্রকল্পের তৃতীয় ধাপ থেকে বাকি অংশ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে সময় দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে একটি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাবনা (ডিপিপি) জমাও দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে তা অনুমোদন পায়নি। এদিকে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই ডিপিপি সংশোধন করে নিজস্ব অর্থায়নে নতুন প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরিতে হাত দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের আওতায় এখনও প্রায় এক হাজার পিলার স্থাপন বাকি। ৩২ কিলোমিটারের বেশি এলাকায় কোনো সীমানা পিলার নেই। আর পুরো ১৪৮ কিলোমিটার এলাকায় নেই সুরক্ষা দেয়াল।
বিআইডব্লিউটিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক আবু জাফর মোহাম্মদ শাহনওয়াজ কবির বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের অধীন থাকা এলাকার মাত্র ১৩ শতাংশ সীমানা পিলারের আওতায় আনা বাকি। আমরা প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে এসব এলাকায় সীমানা নির্ধারণী পিলার স্থাপনের পাশাপাশি হাঁটার পথ, সুরক্ষা দেয়াল, জেটি ও ইকোপার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছি।’
- বিষয় :
- বুড়িগঙ্গা
