বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের আম
গাবতলীতে চালু হচ্ছে ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট
দৈনিক ১২ টন আম জীবাণুমুক্ত করার সক্ষমতা, বাড়বে রপ্তানির সম্ভাবনা
গাবতলীতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) স্থাপন করেছে আধুনিক ‘ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট’ (ভিএইচটি) প্ল্যান্ট। ছবি: সমকাল
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ২২:৩৫ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ২২:৪৪
বাংলাদেশের ‘ফলের রাজা’ আমের জন্য বিশ্ববাজারের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। আন্তর্জাতিক মানের জীবাণুমুক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে রপ্তানিযোগ্য আম প্রস্তুতের জন্য ঢাকার গাবতলীতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) স্থাপন করেছে আধুনিক ‘ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট’ (ভিএইচটি) প্ল্যান্ট। সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। গাবতলীতে অবস্থিত এ প্ল্যান্টে প্রতিদিন প্রায় ১২ টন আম জীবাণুমুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের আমকে ফলমাছি ও অন্যান্য কোয়ারেন্টাইন ঝুঁকি থেকে মুক্ত করে কঠোর আমদানি নীতির দেশগুলোতে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান আম উৎপাদনকারী দেশ। দেশে প্রতিবছর প্রায় ২৫ থেকে ২৭ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়। প্রায় ৮০০ প্রজাতির আমের মধ্যে ২৭০টির বেশি জাত বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়। গোপালভোগ, হিমসাগর বা ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি, হাড়িভাঙা, গৌড়মতি, কাটিমনসহ বিভিন্ন জাতের আমের স্বাদ ও ঘ্রাণ আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রশংসিত। তবে এত বিপুল উৎপাদন সত্ত্বেও রপ্তানি এখনো খুবই সীমিত। এ পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ আম রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ১০০ মেট্রিক টন। উৎপাদনের তুলনায় এই পরিমাণ অত্যন্ত সামান্য।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সবচেয়ে বড় বাধা হলো ফলমাছি ও অন্যান্য কোয়ারেন্টাইন পেস্ট, নিরাপদ উৎপাদন ও মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণের ঘাটতি, দুর্বল কোল্ড-চেইন, অপর্যাপ্ত পরীক্ষাগার এবং ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থার অভাব।
ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট বা বাষ্প-তাপ শোধন হলো এমন একটি প্রযুক্তি, যেখানে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় ফলকে নিয়ন্ত্রিতভাবে উত্তপ্ত করা হয়। এর ফলে ফলের ভেতরে থাকা ফলমাছির ডিম, লার্ভা এবং অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস হয়ে যায়। এই পদ্ধতিতে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। ফলে এটি পরিবেশবান্ধব এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি প্রযুক্তি।
বিএডিসির কর্মকর্তারা জানান, গাবতলীর প্ল্যান্টে প্রতি ব্যাচে প্রায় তিন টন আম বা অন্যান্য কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করা যাবে। ট্রিটমেন্ট শেষে ফল ও সবজি ৩০ মিনিট পানি দিয়ে ধুয়ে শুকানো হবে। এতে ফলের রং উজ্জ্বল হবে, গুণগত মান বজায় থাকবে এবং সংরক্ষণকাল ৮ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত বাড়বে। ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় তিন টন আমের ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি কমলা, মাল্টা, লেবু, বরই, লিচু, আনারস, পেয়ারা, ড্রাগন ফল এবং আলু, টমেটো, শসা, কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজির ওপরও এ প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো ফলমাছি ও কোয়ারেন্টাইন পেস্টের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। এসব দেশে আম রপ্তানি করতে হলে অনুমোদিত ফাইটোস্যানিটারি শোধন বাধ্যতামূলক। বিশ্বের সফল আম রপ্তানিকারক দেশগুলো ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট, হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট ও বিকিরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের আম স্বাদে কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রেতারা শুধু স্বাদ দেখেন না। তারা জানতে চান ফলটি কোথায় উৎপাদিত হয়েছে, কী ধরনের বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান পূরণ হয়েছে কি না, কোন প্যাকহাউসে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে এবং শোধনপ্রক্রিয়ার সঠিক নথি আছে কি না।
বিশ্বের অন্যতম বড় ফলের বাজার চীন। তবে এ বাজারে প্রবেশ করতে হলে কঠোর কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে বাগান নিবন্ধন, প্যাকিং হাউস নিবন্ধন, উত্তম কৃষি চর্চা (গ্যাপ), সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, রাসায়নিক ব্যবহারের রেকর্ড, ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট সুবিধা, কোল্ড-চেইন এবং ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাবতলীর ভিএইচটি প্ল্যান্ট চালু হওয়ায় বাংলাদেশের সামনে চীনের মতো বড় বাজারে প্রবেশের বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যান্ট প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ বলেন, বাংলাদেশের আম শুধু একটি ফল নয়, এটি দেশের কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তবে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান গড়তে হলে পুরো ভ্যালু-চেইনকে আধুনিক করতে হবে। তিনি বলেন, ভিএইচটি শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, এটি বাংলাদেশের আমকে উচ্চমূল্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের দরজা খুলে দিচ্ছে। তাঁর মতে, শুধু একটি প্ল্যান্ট দিয়ে বৃহৎ রপ্তানি বাজার ধরা সম্ভব নয়। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, দিনাজপুর ও রংপুরের মতো প্রধান আম উৎপাদন এলাকায় আঞ্চলিক ভিএইচটি কেন্দ্র, আধুনিক প্যাকহাউস, গ্রেডিং লাইন, প্রি-কুলিং ব্যবস্থা, কোল্ড স্টোরেজ, রেফ্রিজারেটেড পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার গড়ে তুলতে হবে।
