ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

ঐতিহ্যের টমটম এখন শখের বাহন, টিকে থাকার লড়াইও কঠিন

ঐতিহ্যের টমটম এখন শখের বাহন, টিকে থাকার লড়াইও কঠিন
×

একসময় অভিজাতদের আভিজাত্যের প্রতীক এবং নগর পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম হলেও সময়ের পরিবর্তনে টমটম এখন মূলত ঐতিহ্যের স্মারক। ছবি: সমকাল

সাফা খাতুন

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ২২:৫৪

আধুনিক নগরজীবনে দ্রুতগতির যান্ত্রিক যানবাহনের ভিড়েও পুরান ঢাকার রাস্তায় এখনো দেখা মেলে দেড় শতকের ঐতিহ্য বহনকারী টমটম বা ঘোড়ার গাড়ির। একসময় অভিজাতদের আভিজাত্যের প্রতীক এবং নগর পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম হলেও সময়ের পরিবর্তনে টমটম এখন মূলত ঐতিহ্যের স্মারক। দৈনন্দিন যাতায়াতের প্রয়োজনের চেয়ে শখ, বিনোদন কিংবা বিশেষ আয়োজনেই এখন এর ব্যবহার বেশি।

বর্তমানে সদরঘাট-গুলিস্তান রুটেই মূলত টমটম চলাচল করে। তবে যানজট, দ্রুতগতির গণপরিবহনের বিস্তার এবং ঘোড়া রক্ষণাবেক্ষণের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ে ঐতিহ্যবাহী এই বাহন টিকিয়ে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।

ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৫৬ সালের দিকে পুরান ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু হয়। সে সময় এটি ‘ঠিকা গাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল। নবাব, জমিদার ও অভিজাতরা যাতায়াতের পাশাপাশি মর্যাদার প্রতীক হিসেবে এই বাহন ব্যবহার করতেন। পণ্য পরিবহনেও ছিল এর ব্যবহার। একসময় ঢাকার অন্যতম প্রধান গণপরিবহন হলেও বর্তমানে এটি প্রায় বিলুপ্তির পথে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, একটি টমটম তৈরি, কারুকাজ এবং দুটি ঘোড়া কিনতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়। অনেক ক্ষেত্রে খরচ আরও বেশি। একটি টমটমে সাধারণত ১০ থেকে ১২ জন যাত্রী বসতে পারেন। তবে যাত্রী নিয়ে পিচঢালা সড়কে গাড়ি টানতে ঘোড়াগুলোকে যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক টমটম রক্ষণাবেক্ষণকারী সমকালকে বলেন, একসময় ঢাকার বিভিন্ন রুটে প্রায় ৩৬০টি টমটম চলাচল করত। এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৫ থেকে ২৬টিতে। প্রতিটি গাড়ির আলাদা নম্বর রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ঘোড়ার খাবারসহ রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। আগের মতো লাভ নেই। এখন ব্যবসার জন্য নয়, মূলত পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্যই টমটম চালিয়ে যাচ্ছি।’

তার ভাষ্য, বর্তমানে সাধারণ যাত্রী পরিবহনের চেয়ে বিয়ে, সুন্নতে খাতনা, চলচ্চিত্র ও নাটকের শুটিংসহ বিভিন্ন আয়োজনেই টমটমের চাহিদা বেশি। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানান তিনি।

মিজান নামে এক কোচোয়ান জানান, তারা মালিকের কাছ থেকে দৈনিক মজুরিতে টমটম চালান। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ঘোড়ার খাবার, পরিচর্যা ও গাড়ি মেরামতের খরচ অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় তাদের আয় বাড়েনি।

তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন ঘোড়ার খাবার, পরিচর্যা আর গাড়ি মেরামতেই অনেক খরচ হয়। মালিকেরাও আমাদের বেতন বাড়াতে পারছেন না।’ ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ঘোড়া রাখার জন্য পর্যাপ্ত আস্তাবলের অভাবও বড় সমস্যা বলে জানান তিনি।

রায়সাহেব বাজার এলাকায় কথা হয় হৃদয় বেগ নামের এক টমটম আরোহীর সঙ্গে। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে শখের বশে টমটমে চড়তে এসেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘রায়সাহেব বাজার থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত বাসভাড়া মাত্র ১০ টাকা। কিন্তু টমটমে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। তবু সন্তানদের পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই এই অভিজ্ঞতা নেওয়া।’

তবে টমটমকে ঘিরে ভিন্ন মতও রয়েছে। ধীরগতির এই বাহন অনেক সময় ব্যস্ত সড়কে যানজট বাড়ায় বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তীব্র হর্ন ও যান্ত্রিক কোলাহলে ঘোড়া নিয়ন্ত্রণ হারালে পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের জন্য ঝুঁকিরও সৃষ্টি হতে পারে।

পুরান ঢাকার প্রবীণ বাসিন্দা হাজী জলিল বলেন, ‘টমটম আমাদের পুরান ঢাকার ঐতিহ্য। কিন্তু এখন এত যান্ত্রিক গাড়ির ভিড়ে এটি চলাচল করলে অনেক সময় যানজটও তৈরি হয়।’

ঐতিহ্য আর আধুনিক নগরবাস্তবতার টানাপোড়েনে টমটম আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পনা না থাকলে পুরান ঢাকার এই ঐতিহ্য হয়তো একসময় ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

আরও পড়ুন

×