বিনিয়োগ, জ্বালানি ও বাণিজ্যে কাঠামোগত পরিবর্তন আসছে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৫ | আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিনিয়োগ পরিবেশ সহজীকরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে তিনটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬, জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-৩০) এবং আমদানি নীতি আদেশ, ২০২৬-২৯-এর খসড়া অনুমোদন হয়েছে। জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই তিন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, জ্বালানি রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও সময় কমবে, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন গতি সৃষ্টি হবে।
তিন সংস্থা এক ছাতার নিচে
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মন্ত্রিসভার অনুমোদিত ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬ অনুযায়ী বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের (পিপিপিএ) কার্যক্রম সমন্বিত করে নতুন একটি কেন্দ্রীয় বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে। বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন সংস্থায় আলাদাভাবে অনুমোদন, নিবন্ধন, লাইসেন্স ও সেবা নিতে হয়। নতুন আইনের মাধ্যমে এসব সেবা একটি সমন্বিত কাঠামো ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা হবে।
আইন অনুযায়ী অর্থনৈতিক অঞ্চল, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলসহ সব ধরনের শিল্পাঞ্চল একই নীতিগত কাঠামোয় পরিচালিত হবে। লাইসেন্স ও অনুমোদনের সময়সীমা নির্ধারণ, ক্ষুদ্র পিপিপি প্রকল্পে দ্রুত অনুমোদন, অব্যবহৃত সরকারি জমি ও সম্পদের উৎপাদনশীল ব্যবহার এবং সব বিনিয়োগ সেবা একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে
জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষ চাহিদা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কমপক্ষে ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারের মতে, এতে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির চাপ কমবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন সহজ হবে। কৌশলপত্রে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, নেট মিটারিং, ওপেক্স মডেল, স্মার্ট গ্রিড, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস), সৌরচালিত সেচ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বায়ু ও জলবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং অবকাঠামো এবং পরিচ্ছন্ন রান্না প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি ফান্ড গঠন, সহজ ঋণ, ক্রেডিট গ্যারান্টি, কার্বন ক্রেডিট, কর অবকাশ ও স্থানীয় শিল্পে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দক্ষ জনবল তৈরির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ নারী অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে রিয়েল-টাইম অনলাইন ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি জাতীয় পলিসি কাউন্সিল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আমদানি নীতিতে বড় পরিবর্তন
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, তিন বছর মেয়াদি আমদানি নীতি আদেশে (২০২৬-২৯) এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো এলসির পাশাপাশি সেলস কনট্রাক্টের মাধ্যমে মূল্যসীমা ছাড়াই শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পণ্য আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ওপেন অ্যাকাউন্টসহ বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত আধুনিক আন্তর্জাতিক অর্থ পরিশোধ পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রথমবারের মতো মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (ফ্রি ট্রেড জোন) এবং সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ প্রতিষ্ঠার বিধান যুক্ত হয়েছে। সরকারের আশা, এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও পুনঃরপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। নীতিতে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য ফ্রি অব কস্ট (এফওসি) ভিত্তিতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোডেক্স স্ট্যান্ডার্ড, মেলামিনমুক্ত, ফিট ফর হিউম্যান কনজাম্পশন এবং এইচজিপি-ফ্রি মানদণ্ডও যুক্ত করা হয়েছে।
প্রথমবারের মতো ‘প্রবাসী বাংলাদেশি’র সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করে তাদের শিল্প বিনিয়োগ সহজ করতে বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (টিএফএ) বাস্তবায়নে ঝুঁকিভিত্তিক কাস্টমস নিয়ন্ত্রণ, পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট, অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর, ই-লাইসেন্স, অনলাইন সনদ এবং ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ব্যবস্থার বিধানও সংযোজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি কীটনাশকের আমদানি নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে।