বিশ্লেষণ
জলাবদ্ধতার কারণগুলো মানবসৃষ্ট
ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান
ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৫ | আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
জলাবদ্ধতা মৌসুমি হলেও ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে তা আর মৌসুমি সমস্যা নয়। ভারী বৃষ্টি হলেই অনেক স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। কারণগুলো কিন্তু অনেকটাই মানবসৃষ্ট। পানির ধর্মই হলো নিচের দিকে ধাবিত হওয়া। একসময় নদী হয়ে সাগরে যায়।
ঢাকা শহরের বৃষ্টির পানি এখন নদীতে যাওয়ার পথ আমরা রুদ্ধ করে দিয়েছি। রাজধানীর নালা-খালগুলো ভরাট করেছি। তারপর সারাশহরে কংক্রিট বিছিয়ে পানি ভূগর্ভে যাওয়া ঠেকিয়েছি। আবার গাছ যেখানে আগে একসঙ্গে অনেক পানি ভূমিতে পড়া ঠেকাত, সে সুযোগও আর নেই। কারণ গাছগুলো কেটে ফেলেছি। ফলে পানি ভূগর্ভে যাওয়ার স্বাভাবিক সুযোগ নেই। লোকালয়ে আটকে যাচ্ছে।
মোটাদাগে যদি বলি, আমাদের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালোভাবে তৈরি হয়নি। ভারী বৃষ্টি হলে যে সেই পানি ড্রেন শুষে নেবে, সে রকমভাবে তৈরি করা হয়নি। সমন্বিতভাবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরির জন্য কোনো পরিকল্পনাও করা হয়নি। সিটি করপোরেশনের হাতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা হস্তান্তরের পর যেভাবে অগ্রগতি হওয়ার কথা ছিল, সেটিও চোখে পড়েনি। বরং দেখা গেছে আগে যেখানে জলাবদ্ধতা হয়নি, এবার সেখানেও জলাবদ্ধতা হচ্ছে। আর পুরোনো জলাবদ্ধতার অনেক জায়গায় মাত্রা বেড়েছে। এবার এমনও ছবি গণমাধ্যমে এসেছে যে রাস্তাই ভেঙে গেছে। যেসব ড্রেন আছে, সেগুলোও ভালো করে মনে হয় পরিষ্কার করা হয়নি। সেটি থাকলেও হয়তো অবস্থার এত অবনতি হতো না।
আগে এই আটকে যাওয়া ছিল মৌসুমি। কিন্তু এখন আমরা জানি না, কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কার অনুমতি নিয়ে, কোন পরিকল্পনার আওতায় পানিপ্রবাহের পথ আটকে বা প্রবাহের সামান্য পথ রেখে বিশাল সব স্থাপনা করছে ‘উন্নয়নের’ নামে। তদুপরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষা মৌসুম ওলটপালট হয়ে গেছে। বৃষ্টির স্থায়িত্বকাল ও পরিমাণে ভীষণ রকম পরিবর্তন হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে যেখানে আমাদের আরও সুদূরপ্রসারী চিন্তা করে পরিকল্পনা এবং সে অনুযায়ী কাজ করার দরকার ছিল। আমরা সেটি তো করিইনি; বরং তার উল্টো করেছি। আমাদের নগর বা ভূমি ব্যবহার, ড্রেনেজ, পরিবহন ও পরিবেশ-জলবায়ু সুরক্ষা নিয়ে একটি মাত্র সমন্বিত পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল। কিন্তু দিন দিন প্রতিটি সংস্থাই তার নিজস্ব এখতিয়ারের বিষয় নিয়ে যার যার মতো করে ‘মাস্টারপ্ল্যান’ করছে। ফলে একজন যেটিকে মানা করেছে, আরেকজন সেটিকে উৎসাহ ও অনুমোদন দিচ্ছে।
রাজউক ১৯৯৫ সালেই বলেছে ঢাকার চারপাশে তীব্র বৃষ্টির পানি অস্থায়ীভাবে ধারণে ‘রিটেনশন পন্ড’ করতে। কিন্তু সরকার ও এর কোনো অঙ্গপ্রতিষ্ঠানই ‘রিটেনশন পন্ড’ সম্প্রসারিত না করে ওই এলাকায় সম্প্রসারিত আবাসন প্রকল্প, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদির অনুমোদন বা প্রশ্রয় দিয়েছে। আবার শহরের ভেতরে ব্যক্তি, ডেভেলপার তাদের প্রায় সবাই যথানিয়মে ভূগর্ভে পানি প্রবেশের জন্য খোলা জায়গা ছেড়ে বাড়ি করেনি। আর সরকারি প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো সম্প্রসারণকালে পুকুর, জলাভূমি নির্বিচারে ভরাট করা হয়েছে। ইদানীং শুরু হয়েছে মেট্রোরেল বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নামে পার্ক, উন্মুক্ত সবুজ ভূমি দখল, জলাশয় ভরাট ও ‘কংক্রিটীকরণ’।
এখন মৌসুমি জলাবদ্ধতা হলেই তা নিরসনে যে তোড়জোড়, প্রকল্প নেওয়া ও হাজার কোটি টাকা খরচ করার আয়োজন করা হয়, তার প্রায় সব কেবল উপসর্গ কমাতে নেওয়া হয়। কিন্তু মূল কারণ আমলে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের কোনো ইচ্ছা ও সক্ষমতা কোনোটাই বর্তমান সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতে প্রতিফলিত হয় না। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছিল বলেও আমরা জানি না। ফলে আমাদের ইচ্ছা ও অনিচ্ছাকৃত ভুল সমতল ঢাকা, চট্টগ্রাম, পাহাড়ের বান্দরবান, সিলেট শহরে জল আটকে দিচ্ছে; জীবন ও অর্থনীতির বিনাশ ঘটাচ্ছে। কিন্তু অপাত্রে ‘অর্থ দান’ কিংবা সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তি, ভূমিদস্যু, কতিপয় পেশাজীবীর পকেট ভারী করা ঠেকাতে পারছে না।
জাতীয় ও আঞ্চলিক স্থানিক পরিকল্পনা ফ্রেমওয়ার্কের আলোকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা করা দরকার ছিল। তারপরই কেবল আর্থসামাজিক চাহিদাকে মাথায় নিয়ে স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প বা অবকাঠামো নির্মাণ করা যেত। আবার জাতীয় ও আঞ্চলিক স্থানিক পরিকল্পনা ফ্রেমওয়ার্ক ও সমন্বিত পরিকল্পনার কৌশলগত পরিবেশগত মূল্যায়ন করে তারপর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যাওয়া দরকার ছিল। আমরা সেটি না করে তার উল্টোটা করেছি। কোনো রকম পরিকল্পনা ছাড়াই শত শত কোটি টাকা আমরা খরচ করেছি। কিন্তু জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের জন্য কিছু করা হয়নি। এখন যে অবস্থায় ঢাকা শহর পৌঁছেছে, মনে হয় না এ রকম ভারী বৃষ্টি হলে কখনও আমরা জলাবদ্ধতামুক্ত থাকতে পারব। তারপরও চেষ্টা করতে হবে। প্রাকৃতিকভাবে যে জলাধারগুলো আছে, সেগুলো রক্ষা করতে হবে। নতুন জলাধার সৃষ্টি করতে হবে। খালগুলোকে স্থায়ীভাবে কীভাবে রক্ষা করা যায়, সেটা করতে হবে। বৃষ্টির পানিকে দ্রুত খালে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে কাজ করলে অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব হবে।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি); অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ (ইউআরপি), বুয়েট
- বিষয় :
- মতামত
- জলাবদ্ধতা
- ভারী বৃষ্টি