আইআরসির সতর্কবার্তা
এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশে দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়বে
প্রতীকী ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
এল নিনোর প্রভাব আরও জোরালো হওয়ায় বাংলাদেশসহ পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে আগামী কয়েক সপ্তাহে বন্যা, ভূমিধস, তাপপ্রবাহ, খরা ও সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি)। গত সোমবার প্রকাশিত বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, কেনিয়া, উগান্ডা, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের লাখো মানুষ এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
আইআরসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। জুলাইয়ের শুরু থেকে ১০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সংস্থাটি বলছে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় আবহাওয়ার বৈরিতা আরও বাড়তে পারে। ফলে বাংলাদেশে ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি অব্যাহত থাকার পাশাপাশি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগও বাড়বে।
আইআরসি আরও জানায়, পাকিস্তানে মৌসুমি বৃষ্টি স্বাভাবিকের তুলনায় কম হতে পারে এবং তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তবে উত্তরাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ গলে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। আফগানিস্তানেও গড়ের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।
পূর্ব আফ্রিকায় পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। সোমালিয়ার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দেশটিতে ইতোমধ্যে ৪৮ লাখ মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। ২০২৩ সালের এল নিনোজনিত বন্যায় সেখানে প্রায় ১৩ হাজার টন ফসল নষ্ট হয়েছিল। এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
আইআরসি জানায়, ইথিওপিয়ার উঁচু এলাকায় ভারী বৃষ্টি এবং সোমালিয়ার মৌসুমি বৃষ্টির কারণে প্রধান নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে পানির উৎস দূষিত হয়ে কলেরা ও তীব্র পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে।
আইআরসির জরুরি কার্যক্রমবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট বব কিচেন বলেন, একই সময়ে একাধিক সংকট তৈরি হচ্ছে। যে জনগোষ্ঠীর নতুন ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা সবচেয়ে কম, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
বাংলাদেশে টানা বৃষ্টির পেছনে কারণ কী
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে মাসের প্রথম ১১ দিনেই জুলাই মাসের মোট স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭৫ শতাংশ হয়ে গেছে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, নিম্নচাপের পাশাপাশি সক্রিয় মৌসুমি বায়ুই এই বৃষ্টির প্রধান কারণ। মৌসুমি বায়ু এ বছর স্বাভাবিকের তুলনায় অন্তত সাত দিন দেরিতে এলেও জুলাইয়ের শুরুতে তা দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে।
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ বলেন, উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া নিম্নচাপের গতিপথ এবার স্বাভাবিকের চেয়ে ভিন্ন ছিল। সাধারণত নিম্নচাপ খুলনা-বরিশাল হয়ে মধ্যাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হলেও এবার জলীয় বাষ্পসমৃদ্ধ বায়ু চট্টগ্রাম বিভাগের দিকে বেশি প্রবাহিত হয়েছে। ফলে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়েছে।
তিনি বলেন, এল নিনোর একটি বৈশিষ্ট্য হলো দীর্ঘ মেয়াদে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া, তবে এর প্রভাবে স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিও হতে পারে। এবার দেশের বৃষ্টিপাত সেই বিপরীতধর্মী প্রতিক্রিয়ারই একটি উদাহরণ।
সামনে আরও বৃষ্টির আভাস
টানা বৃষ্টির পর গতকাল অনেকটাই উজ্জ্বল ছিল রাজধানী ঢাকার আকাশ। আবহাওয়া অধিদপ্তর পূর্বাভাসে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আবহাওয়া পরিস্থিতি প্রায় একই রকম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর পর আবারও বাড়বে বৃষ্টির প্রবণতা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচ দিনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে।
আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির বলেন, শুক্রবারের পর বৃষ্টিপাত কিছুটা বাড়তে পারে। তবে সম্প্রতি যে ধরনের অতিভারী বর্ষণ হয়েছে, তা পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। মাসের শেষ দিকে আরেকটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, তবে সেটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আইআরসি এল নিনোর ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর প্রতি আগাম প্রস্তুতি জোরদার, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে নগদ সহায়তা, বিশুদ্ধ পানি এবং আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, দুর্যোগ আঘাত হানার আগে বিনিয়োগ করলে প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষতি এবং দুর্ভোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।