পিরোজপুরে ঝর্ণা রানী হত্যা
হাইকোর্টে খালাস পেলেন মৃত্যুদন্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ১৯:৫২
পিরোজপুরের নেছারাবাদে কলেজছাত্রী ঝর্ণা রানী দেউরীকে অপহরণ ও হত্যার মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি লিটন মণ্ডলকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। এক আপিল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বুধবার এ রায় দেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, প্রসিকিউশন আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ‘সম্পূর্ণ ব্যর্থ’ হয়েছে। পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তদন্তের ‘দুর্বলতা’ বিবেচনায় নিয়ে এ খালাস দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন
রায়ের পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির বলেন, সুরতহাল ও ময়নাতদন্তে শ্বাসরোধে মৃত্যুর কথা বলা হলেও লাশ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের আইনি দুর্বলতা ছিল। ভিকটিমের বাবা সরাসরি মৃতদেহ না দেখেই থানায় কেবল কাপড়চোপড় এবং পুলিশের দেখানো একটি ছবির ওপর ভিত্তি করে মেয়েকে শনাক্ত করেন। শনাক্তকরণের জন্য ব্যবহৃত ওই ছবিটি নিম্ন আদালতের নথিতে (এলসিআর) সংযুক্ত ছিল না। অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত আসামিকে খালাস দিয়েছেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী বুলবুল রাবেয়া বানু সাংবাদিকদের বলেন, শুরুতে মামলাটা করা হয়েছিল অপহরণের অভিযোগে, পরে এর সঙ্গে হত্যা যুক্ত করা হয়। কিন্তু নথিপত্র ও সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুযায়ী ঘটনাটি কোনোভাবেই অপহরণের আইনি সংজ্ঞায় পড়ে না। তিনি বলেন, দণ্ডবিধির ৩৬২ ধারা অনুযায়ী বলপ্রয়োগ, প্রলুব্ধ করা, ফুসলিয়ে নেওয়া, ভুল বোঝানো বা ভীতি প্রদর্শন করে কোনো স্থান থেকে কোনো ব্যক্তিকে অন্যত্র যেতে বাধ্য করলে তা অপহরণ হবে। কিন্তু এই মামলায় প্রসিকিউশন এর কোনোটিই প্রমাণ করতে পারেনি।
রায়ের পর্যবেক্ষণের বিষয়ে আইনজীবী রাবেয়া বানু বলেন, মামলায় কোনো স্বাধীন চাক্ষুষ সাক্ষী ছিলেন না। যিনি চাক্ষুষ সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি ভিকটিমের আত্মীয়। তাদের বয়ান থেকেই জানা যায় যে, আসামি ও ভিকটিমের মধ্যে পূর্ব থেকেই প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পারিপার্শ্বিক অবস্থা নির্দেশ করে যে, ভিকটিম স্বেচ্ছায় আসামির সাথে ট্রলারে উঠেছিলেন, যা অপহরণের দাবিকে নাকচ করে দেন।
আদালত মনে করেন, 'লাস্ট সিন থিওরি' বা আসামির সাথে ভিকটিমকে সর্বশেষ দেখা যাওয়ার সূত্র ধরে হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা (চেইন অব ইভেন্টস) প্রমাণ করা যায়নি। ফলে আসামি শুরু থেকে পলাতক থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র একজন আত্মীয়ের সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া বিচারিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিরাপদ নয় বলে আদালত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মামলার নথিতে বলা হয়, ভিকটিম ঝর্ণা রাণী দেউরী রামচন্দ্রপুর শাহ মাহামুদিয়া কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী ছিলেন। ২০০৯ সালের ১৪ মে বাগেরহাটের কচুয়া থানার আন্দার মানিক গ্রামে বড় বোনের বাড়ি থেকে ফেরার পথে ঝর্ণা নিখোঁজ হন। ওইদিনই স্বরূপকাঠী কৌরিখাড়া খেয়ার ট্রলারে লিটন ও তার সহযোগীদের সাথে ঝর্ণাকে দেখতে পান সুমন দেউরী নামের এক সাক্ষী।
দশদিন পর ২৪ মে ঝর্নার বাবা সুভাষ চন্দ্র দেউরী নেছারাবাদ থানায় মামলা করেন। এজাহারে বলা হয়, প্রতিবেশী লিটন মণ্ডল ঝর্ণাকে উত্ত্যক্ত করত এবং বিয়ের প্রস্তাব দিলে পরিবার তা প্রত্যাখ্যান করে। পরে ১৭ মে পত্রিকায় বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীতে অজ্ঞাত তরুণীর লাশ উদ্ধারের খবর দেখে ভিকটিমের বাবা থানায় গিয়ে পরিধেয় বস্ত্র দেখে তা ঝর্ণার লাশ বলে শনাক্ত করেন।
২০১৯ সালের ২৭ জুন পিরোজপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মিজানুর রহমান এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে পলাতক আসামি লিটন মণ্ডলকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অপরাধে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় অপর তিন আসামিকে খালাস দেন বিচারিক আদালত। আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মোট ১২ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল।
- বিষয় :
- মামলা
- আদালত
- মৃত্যুদণ্ড
- খালাস