জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড
৪৫ বছর পর সেনা কর্মকর্তা আটক
মোজাফফর হোসেন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
৪৫ বছর পলাতক থাকার পর সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে (৭৭) আটক করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিবি)। গত বুধবার রাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকার একটি বাসা থেকে তাঁকে আটক করা হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, মোজাফফর হোসেনের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর ডিবি তাঁকে আটক করেছে।
এর পর রাত ৯টার দিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিএমপি) মোজাফফর হোসেনকে আটকের ঘটনায় আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয়। এতে বলা হয়, মোজাফফর হোসেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পলাতক আসামি।
ডিএমপির বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর থেকে মেজর মোজাফফর হোসেন আত্মগোপনে ছিলেন। বনানীর একটি বাসায় তাঁর অবস্থান শনাক্তের পর বুধবার রাত ১০টার দিকে সেখানে অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর বিষয়টি আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনকে অবহিত করা হয়। পরদিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের একটি দলের কাছে তাঁকে হস্তান্তর করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোজাফফর হোসেনের বিরুদ্ধে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা রয়েছে। কোর্ট মার্শালের জন্য তাঁকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। জিয়াউর রহমান বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। ঘটনার আগের দিন তিনি চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন। তাঁর দুই দিনের সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসা করা। ঘটনার দিন নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে মধ্যরাতে তিনি ঘুমাতে যান। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেনাবাহিনীর একটি বিপথগামী দল তাঁর ওপর গুলি চালায় এবং তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। পরে রাষ্ট্রীয় বেতারে তাঁর মৃত্যুর খবর প্রচার করা হয়। এর পর উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা পর জিয়াউর রহমানের লাশ গোপনে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড়ি এলাকায় দাফন করা হয়।
১৯৮১ সালের ১ জুন জিয়াউর রহমানের মরদেহ খুঁজতে বের হয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার আ স ম হান্নান শাহ (প্রয়াত বিএনপি নেতা)। পরবর্তী সময় বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, জিয়াউর রহমানের মরদেহ খুঁজে বের করার জন্য তাঁরা কাপ্তাই রাস্তার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন এবং অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নতুন কবরের সন্ধান করছিলেন।
তখন সেখানকার গ্রামবাসী একটি ছোট পাহাড় দেখিয়ে জানালেন, কয়েক দিন আগে সৈন্যরা সেখানে একজনকে কবর দিয়েছেন। গ্রামবাসীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হান্নান শাহ সৈন্যদের নিয়ে সেখানে গিয়ে দেখেন, নতুন মাটিতে চাপা দেওয়া একটি কবর। সেখানে মাটি খুঁড়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ আরও দুই সেনা কর্মকর্তার মরদেহ দেখতে পান তারা। তখন জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ তুলে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে আনা হয়। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। পরদিন তাঁর মরদেহ জনসাধারণের শ্রদ্ধার জন্য সংসদ ভবনে রাখা হয়। এর পর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজা শেষে ক্রিসেন্ট লেকের উত্তর পাশে (বর্তমানে চন্দ্রিমা উদ্যান) দাফন করা হয়।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মঞ্জুর নিহত হন। বিদ্রোহে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৮ সেনা কর্মকর্তার সামরিক আদালতে বিচার করা হয়। এর মধ্যে ১৩ জনের ফাঁসি হয়। অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর মেজর মোজাফফর হোসেন ও মেজর এস এম খালেদ পালিয়ে যান। তাদের দুজনকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তখন পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। পলাতক অবস্থায় মারা যান মেজর খালেদ।
মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরী বীরবিক্রম তাঁর ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’ বইয়ে খালেদ ও মোজাফফর সম্পর্কে লিখেছেন। ‘হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে খালেদ ও মোজাফফর যা বলেন’ শীর্ষক অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি যখন থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত (১৯৮৯-৯৩) তখন জিয়া হত্যায় অভিযুক্ত অন্যতম পলাতক আসামি মেজর খালেদ ব্যাংককে ছিলেন। অপর পলাতক আসামি মেজর মোজাফফরও খালেদকে নিয়ে ব্যাংককে আমার সঙ্গে দেখা করেন। জিয়া হত্যার বিষয়ে তাদের সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা হয়।’
ওই বইয়ের ‘লে. কর্নেল মতির ক্ষোভের কারণ’ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, যেসব অফিসারের উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জেনারেল জিয়াকে হত্যা করা হয়, তাদের মধ্যে একমাত্র মেজর খালেদ ও মেজর মোজাফফরই জীবিত ছিলেন। পরে মোজাফফর ভারতে এবং খালেদ ব্যাংককে চলে যান। বাকিদের কোর্ট মার্শালে ফাঁসি দেওয়া হয়।
অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে মেজর মোজাফফরের ভূমিকা সম্পর্কে লিখেছেন। তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে কাছে ছিলেন মেজর মোজাফফর আর ক্যাপ্টেন মোসলেহউদ্দিন। মেজর মোজাফফর দৃশ্যত ভয়ে কাঁপছিলেন। মোসলেহউদ্দিন প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করতে চাইছিলেন। তিনি বলছিলেন, স্যার, আপনি ঘাবড়াবেন না। এখানে ভয়ের কিছুই নেই।
হত্যাকাণ্ডের পরের বর্ণনায় অ্যান্থনি লিখেছেন, জিপে চড়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাবার পথে মেজর মোজাফফর ক্ষোভে আর দুঃখে কাঁপতে কাঁপতে লে. মোসলেহউদ্দিনকে বলছিল : ‘আমি জানতাম না, আমরা প্রেসিডেন্টকে খুন করতে যাচ্ছি। আমার ধারণা ছিল, আমরা কেবলই প্রেসিডেন্টকে বের করে নিয়ে আসতে যাচ্ছি।’
- বিষয় :
- হত্যাকাণ্ড