বন্ধ শিশুযত্ন কেন্দ্র
বাড়ছে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে সাধারণত ঘরের পাশে পুকুর, উঠানের ধারে ডোবা, বাড়ির পেছনে খাল কিংবা বর্ষায় নিচু জমিতে পানি থই থই করে। এই পরিবেশে বেড়ে ওঠে অধিকাংশ শিশু। কিন্তু প্রতিবছর কয়েক হাজার শিশুর মৃত্যু হয় বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে পানিতে ডুবে। যেসব কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগ এ ধরনের মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল, সেগুলোর একটি বড় অংশ বন্ধ রয়েছে।
এমন পরিস্থতিতে আজ শনিবার ২৫ জুলাই দেশে বিশ্ব পানিতে ডোবা প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর স্রোত বদলে দিই’। এই আহ্বান বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ অধিকাংশ শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে, এমন সময় যখন পরিবারের সদস্যরা দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত থাকেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কমিউনিটিভিত্তিক শিশুযত্ন কেন্দ্র, জীবনরক্ষাকারী সাঁতার প্রশিক্ষণ, স্থানীয় সচেতনতা এবং স্থায়ী সরকারি অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
দিবসটি উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যু কমাতে কার্যকর কর্মসূচিগুলো এখনও প্রকল্পনির্ভর হওয়ায় প্রকল্প শেষ হলেই সেবা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই শুধু প্রকল্প নয়, স্থায়ী জনসেবা নিতে হবে।
বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে ২০২৩ অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৮ হাজার ৬৬৫ জন পানিতে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে ১৪ হাজার ২৬৯ জন শিশু। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে এক থেকে চার বছরের শিশুরা। অধিকাংশ মৃত্যুই ঘটে বাড়ির কয়েক গজের মধ্যে থাকা পুকুর, ডোবা কিংবা জলাশয়ে।
শেরপুরের বাজিতখিলা গ্রামের নুসরাত জাহান রিতুর চার বছরের মেয়ে আফিয়া জান্নাত। বাড়ির পাশের পুকুরটি বর্ষার পানিতে ভরে গেছে। মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন তিনি। রিতু বলেন, আগে এলাকার শিশুযত্ন কেন্দ্রে প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মেয়েকে রেখে নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করতে পারতেন। গত ডিসেম্বরে কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার সন্তানকে নিরাপদে রাখা অনেক কঠিন হয়ে গেছে। রিতুর মতো হাজারো মা একই উদ্বেগে দিন কাটান।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ২০২২ সালে ৩০৬ কোটি টাকার ‘সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার সুবিধা প্রদান (আইসিবিসি)’ প্রকল্প চালু করে। এই প্রকল্পের আওতায় ১৬ জেলার ৪৫ উপজেলায় আট হাজার শিশুযত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। সেখানে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় দুই লাখ শিশুর নিরাপদ তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা হতো। একই সঙ্গে এক হাজার ৬০০টি সুইম-সেইফ কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় তিন লাখ ৬০ হাজার শিশুকে জীবনরক্ষাকারী সাঁতার শেখানো হয়। কিন্তু প্রকল্পের প্রথম ধাপ শেষ হওয়ার পর গত ডিসেম্বর থেকেই কেন্দ্রগুলো বন্ধ রয়েছে। নতুন প্রকল্প অনুমোদন না পাওয়ায় এখনও কার্যক্রম আবার শুরু করা যায়নি। অথচ বর্ষা মৌসুমেই দেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে।
ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে পানিতে ডুবে মারা গেছে ৫৮৩ জন। এর মধ্যে ৫২৭ জনই শিশু। গত বছর দেশে ডুবে মারা যায় এক হাজার ৩১১ জন। তাদের মধ্যে এক হাজার ১৮৪ জন, অর্থাৎ প্রায় ৯০ শতাংশই ছিল শিশু।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগস্ট মাসে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ তখন বর্ষার পানি বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামীণ পরিবারের সদস্যরা কৃষিকাজ ও গৃহস্থালির কাজে বেশি ব্যস্ত থাকেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যেই অধিকাংশ শিশু ডুবে মারা যায়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রে নিবন্ধিত কোনো শিশুর ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে দেখা গেছে, এসব কেন্দ্রে যাওয়া শিশুদের ভাষা, চলাফেরা ও আত্মবিশ্বাসের বিকাশ তুলনামূলক ভালো হয়েছে। একই সঙ্গে মায়েরা পড়াশোনা বা কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন এবং স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
কিন্তু কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন ছোট শিশুরা দীর্ঘ সময় তদারকি ছাড়া থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বয়স্ক দাদা-দাদি বা নানা-নানির কাছে রেখে যেতে হয়, যাদের পক্ষে সার্বক্ষণিক নজর রাখা সম্ভব হয় না।
সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্র
শেরপুরের পরিচর্যাকারী রুপালী আক্তার বলেন, ‘জানুয়ারি থেকে ভাতা বন্ধ হওয়ায় কেন্দ্রটিও বন্ধ হয়ে গেছে। এলাকার মায়েরা প্রায়ই জানতে চান, কেন্দ্র কবে খুলবে।’
পরিচর্যাকারী লতিফা খাতুন বলেন, ২০ থেকে ২৫টি শিশুর দেখাশোনা করতেন। কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পর আয়ের পাশাপাশি সেই আনন্দও হারিয়েছেন।
প্রকল্প পরিচালক তারিকুল ইসলাম চৌধুরী জানান, ৮৩৮ কোটি টাকার নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। এতে ১৬ জেলার পরিবর্তে ৩০ জেলা এবং ৪৫ উপজেলার পরিবর্তে ৭৯ উপজেলায় কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ১৩ হাজারের বেশি শিশুযত্ন কেন্দ্র চালু করে প্রায় ১০ লাখ ৬ হাজার শিশুকে সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিচর্যাকারীদের মাসিক ভাতা চার হাজার টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকায় উন্নীত করারও প্রস্তাব রয়েছে। তিনি বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের পর সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া শেষ করে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করতে পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে।
সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুর জামান বলেন, একটি শিশু শুধু বড় জলাশয়ে নয়, অল্প পানিতেও ডুবে মারা যেতে পারে। তাই নিরাপদ তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। প্রকল্প শেষ হলেই সেবা বন্ধ হয়ে যায়। এতে কমিউনিটি ভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে। তাই শিশুযত্ন কেন্দ্র পরিচালনার অর্থ রাজস্ব বাজেট থেকে স্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেওয়া উচিত।
সমষ্টির গবেষণা ও যোগাযোগ পরিচালক রেজাউল হক বলেন, জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যু ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনে অর্থের উৎস, বাজেট লাইন ও ব্যয়-পর্যবেক্ষণ আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) উপপরিচালক মো. আবুল বরকাত বলেন, তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের
শিশুযত্ন কেন্দ্রে রাখলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি ৮২ শতাংশ পর্যন্ত কমে। অন্যদিকে ছয় থেকে ১০ বছরের শিশুদের জীবনরক্ষাকারী সাঁতার ও উদ্ধার কৌশল শেখালে মৃত্যুঝুঁকি ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
অর্থ বিভাগের উপসচিব জামিরা শবনম বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার, স্থানীয় সরকার এবং অন্যান্য অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।’
- বিষয় :
- মৃত্যু