‘বেশি কষ্ট দিচ্ছে হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ ঢাবি শিক্ষার্থী শাহাদাত
শাহাদাত হোসেন
রাসেল মাহমুদ
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১৭ | আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ডান হাত দিয়ে মোবাইল ফোন তুলতে গেলে মাঝে মাঝে পড়ে যায়। হাত দিয়ে খেতে সময় লাগে। ভারী কিছু ধরতে বা আগের মতো লেখা সম্ভব হয় না। কয়েক মিনিট লিখলেই হাত জমে আসে। দ্রুত হাঁটলে হাঁটু নিয়েও ভয় কাজ করে। তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতার চেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস।
গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্সার ভবনে এমআরআই করানোর পর সমকালকে এসব কথা বলেন জুলাই আন্দোলনে আহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন সাব্বির।
তিনি বলেন, ‘ডান হাতটা আমার জীবন থেকে অর্ধেক চলে গেছে। এটি আমি চাইলেও আর আগের মতো ফিরে পাব না। আমার একটা হাত আছে, কিন্তু নেই–এমন একটা পরিস্থিতি। এই হাতে কিছু নিতে গেলে তা পড়ে যায়। আগের মতো আর লিখতে পারি না। শ্রুতি লেখক দিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। এখন মনে হয়, আমার স্বপ্নযাত্রা থেমে গেছে।’
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আরজি নিয়ামত গ্রামের যুবক শাহাদাত। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার পর প্রথমে ‘গ’ শ্রেণি এবং পরে ‘ক’ শ্রেণির জুলাইযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হন। শারীরিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির আশায় চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকার তাঁকে থাইল্যান্ডে পাঠায়। দুই মাস চিকিৎসা শেষে ৫ এপ্রিল তিনি দেশে ফেরেন। কিন্তু এখনও ফেরা হয়নি স্বাভাবিক জীবনে।
‘বুঝতেই পারিনি গুলি লেগেছে’
২০২৪ সালের জুলাই মাস। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তখন সারাদেশ উত্তাল। ১৫ জুলাই ঢাকা থেকে রংপুরে চলে যান শাহাদাত। ১৬ জুলাই আন্দোলনে যোগ দিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) প্রধান ফটকের সামনে গোলাগুলিতে আহত হন। শাহাদাত বলেন, ‘তখন বুঝতেই পারিনি গুলি লেগেছে। কিছুক্ষণ পর চোখ অন্ধকার হয়ে আসে, এরপর অজ্ঞান হয়ে যাই। জ্ঞান ফেরার পর বুঝতে পারি হাত আর স্পর্শকাতর অঙ্গে প্রচণ্ড ব্যথা।’
একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেন তিনি। ডান হাতের কবজিতে দুটি গুলির ধাতব অংশ (প্লেট), স্পর্শকাতর অঙ্গ ও হাঁটুতে স্প্লিন্টার থেকে যায়। বেরোবির ঘটনায় ৩০০ জনকে আসামি করে করা একটি মামলায় তাঁর নামও জড়িয়ে যায়।
এ সময় তাঁর ডান হাতের অবস্থা দ্রুত অবনতি হয়। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ, নিটোর, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা নেন। শ্রুতি লেখকের সহায়তায় পরীক্ষা দিতে হয় এবং ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে থাইল্যান্ডে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
শাহাদাত জানান, থাইল্যান্ডের ভেজথানি ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ছয় ঘণ্টা থেরাপি দেওয়া হতো। বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে লেখার অনুশীলন, পেশি সচল রাখার ব্যায়ামসহ নানা ধরনের পুনর্বাসন চিকিৎসা চলেছে। চিকিৎসকেরা আরেকটি অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিলেও ঝুঁকির কারণে রাজি হননি। তবে ডান হাতের নার্ভের পাশে আরেকটি ধাতব অংশ অপসারণের অনুমতি দেন। পরে সেটি অস্ত্রোপচার করা হয়। এতে ব্যথা কিছুটা কমলেও হাতের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা এখনও ফেরেনি।
বর্তমানে শাহাদাতের ডান হাঁটুতেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। হাঁটতে ও সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। চিকিৎসকরা বলেছেন, দীর্ঘদিন ওষুধ সেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এ সমস্যা হয়েছে।
আজীবন চিকিৎসার দাবি
শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি শাহাদাতের মানসিক চাপও বেড়েছে। একসময় বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখতেন। এখন ডান হাতে লিখতে না পারায় শ্রুতি লেখকের সহায়তায় পরীক্ষা দিতে হয়। কয়েক মিনিট লিখলেই হাত জমে আসে।
২০১৮ সালে তাঁর বাবা আনিছুর রহমান স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। পরিবারের জমি বন্ধক রেখে ছোট বোনের পড়াশোনা চলছে। আহত জুলাইযোদ্ধা হিসেবে তিনি সরকারি অনুদান ও বর্তমানে মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পেলেও ভবিষ্যতে তা যথেষ্ট হবে না বলে মনে করেন।
- বিষয় :
- জুলাই গণহত্যা
- জুলাই আন্দোলন