ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১৫ মাসে ৩৫২ পাচার মামলা, ৩৩৭টির আসামি খালাস

১৫ মাসে ৩৫২ পাচার মামলা, ৩৩৭টির আসামি খালাস
×

সমকাল

বকুল আহমেদ

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১২

বিদেশে ভালো চাকরি, উচ্চ বেতন আর উন্নত জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখিয়ে ঢাকার দক্ষিণ বনশ্রীর তরুণ তানভীর হোসাইনকে পাঠানো হয়েছিল কম্বোডিয়া। বিমানবন্দরে নামতেই এক বাংলাদেশি তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। পরে একটি ক্যাসিনোর ভেতর দিয়ে ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে নেওয়া হয়। তখনও তিনি ঘুণাক্ষরে বোঝেননি, তাঁকে একটি অনলাইন স্ক্যাম সেন্টারে চীনা নাগরিকদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। 

সেখানে তানভীর হোসাইনের কাজ ছিল ‘হানি ট্র্যাপ’-এর মাধ্যমে তরুণী পরিচয়ে অনলাইনে সম্পর্ক গড়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। এ কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাতেই তাঁর ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। 

মানব পাচারের শিকার সেই তানভীর হোসাইন সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন। শুধু তানভীর একা নন; মোটা বেতনে চাকরির টোপ ফেলে বাংলাদেশিদের পাচার করে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে সংঘবদ্ধ পাচার চক্র। তারা ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে মানব পাচারের ধরন ও কৌশল পাল্টিয়েছে। ভুয়া অনলাইনে বিদেশে চাকরির বিজ্ঞাপন, ডিপফেক প্রযুক্তি এবং নানা অ্যাপের মাধ্যমে তরুণদের টার্গেট করছে তারা। 

কৌশল পাল্টিয়ে পাচারকারীরা সক্রিয় থাকলেও অনেক অভিযুক্ত ধরা পড়ার পর শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে। খোদ সরকারি হিসাবেই বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত মার্চ পর্যন্ত ১৫ মাসে ৩৫২ মানব পাচার মামলার বিচার নিষ্পত্তি হয়। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এর মধ্যে মাত্র ১৫ মামলার ৩৯ আসামি সাজা পেয়েছে। বাকি ৩৩৭ মামলার এক হাজার ২৫৯ আসামি খালাস পেয়ে যান। 

এ পটভূমিতে আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশে বিভিন্ন এনজিও এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান সচেতনমূলক নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। এবারের প্রতিপাদ্য– ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, মানব পাচার রোধে শুধু আইনি কাঠামো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সচেতনতা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থাপনা। মানব পাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

জানতে চাইলে পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, মানব পাচারে মুনাফালোভী লোকজন জড়িত। তারা প্রতারণার মাধ্যমে অবৈধ পথে মানুষকে বিদেশে পাঠিয়ে বিপদে ফেলছে। এসব ঘটনার মামলায় আসামি গ্রেপ্তারও হচ্ছে। তবে সাজার হার কম। এর কারণ, অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা নানা প্রলোভনে আসামির সঙ্গে আপস করেন। পরে তারা আর আদালতে সাক্ষ্য দেন না। 

কত মামলা 
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ৮ বছর ৫ মাসে মানব পাচার সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৬ হাজার ৮২৫টি। আসামি সংখ্যা ৩০ হাজার ২৯৫। এর মধ্যে ১১ হাজার ২৮০ জনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করেছে। এই এক বছরে মানব পাচারের শিকার হয়েছেন ১০ হাজার ৪৪৪ জন এবং উদ্ধার করা হয়েছে ৭ হাজার ১৯০ জনকে। 

গত জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে মানব পাচারের ঘটনায় সারাদেশে মামলা হয়েছে ৫০০। এতে আসামি সংখ্যা ২ হাজার ৩৩৪। এর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৫১ জনকে। বাকি আসামি দেশ-বিদেশে পলাতক। এই পাঁচ মাসে সংঘবদ্ধ চক্র ১ হাজার ১৩৫ জনকে বিভিন্ন দেশে পাচার করেছে। ৮০৭ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়েছে। 

সাজার হার কম
মানব পাচার প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে মানব পাচার সংক্রান্ত ৭৩৯টি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ওই বছর আদালতে ২৪৫টি মামলার বিচার নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে ৯টি মামলায় ২৮ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়। বাকি ২৩৬ মামলার আসামি খালাস পেয়ে যায়। তবে জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের দাবি, গত বছর ৪২টি মামলায় ৭৬ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে আদালতে ১০৭টি মামলার বিচার নিষ্পত্তি হয়। এর মধ্যে ছয়টি মামলায় ১১ জনের সাজা হয়। বাকি ১০১ মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। তবে জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের তথ্য বলছে, এই তিন মাসে ২০টি মামলায় ৪০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। 

এদিকে, ৩১ মার্চ পর্যন্ত ১ হাজার ৮১৭টি মামলা তদন্তাধীন ছিল এবং আদালতে বিচারাধীন ছিল ৩ হাজার ২৭৮টি মামলা। গতকাল বুধবারের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, মানব পাচার মামলায় সারাদেশের কারাগারে বন্দি সংখ্যা ৪০০।

নতুন আইনে বিচার ত্বরান্বিত হবে
মানব পাচার ও অভিবাসন প্রত্যাশী চোরাচালান প্রতিরোধে সরকার নতুন আইন প্রণয়ন করেছে। এ আইনে অভিবাসন প্রত্যাশী চোরাচালানকে আলাদা অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্ক্যামিং, প্রতারণামূলক নিয়োগ, ডিজিটাল মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন ও জোর করে অপরাধ সংঘটনে বাধ্য করাকে শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে। এতে অপরাধ-সংশ্লিষ্ট সম্পদ জব্দের সুযোগ রাখার পাশাপাশি পাচারের শিকার হয়ে অপরাধে বাধ্য হওয়া ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধী গণ্য না করার সুরক্ষাও জোরদার করা হয়েছে। 

জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সময়ের সঙ্গে আইনের ধরন বদল হয়। আশার কথা, সরকার মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২কে যুগোপযোগী করে ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। আশা করছি, নতুন আইনের অধীনে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধবিষয়ক মামলার তদন্ত ও বিচার কাজ ত্বরান্বিত হবে।

চক্রের ‘মিষ্টিকথা’য় প্রতারিত
সংসারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্নে অনেকেই ভিটেমাটি, জমি কিংবা পরিবারের শেষ সম্বল বিক্রি করে বিদেশযাত্রার পথ বেছে নেন। চক্রগুলো বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি ও দ্রুত সচ্ছল হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলছে মানুষকে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অনলাইন স্ক্যাম সেন্টারে আটকে রেখে নির্যাতন ও জোর করে সাইবার প্রতারণায় ব্যবহার করার অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে। পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে লিবিয়ার বন্দিশিবিরে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে। নির্যাতনের ভিডিও দেশে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণ আদায় করছে চক্রের সদস্যরা। এ ছাড়া কারও কারও ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে ইউরোপে পাঠায় তারা। স্বপ্নের সেই পথ কখনও পরিণত হয় মৃত্যুযাত্রায়। 

সংসারে সচ্ছলতা ফেরার স্বপ্নে চক্রের ফাঁদে পড়ে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালিতে যাওয়ার সময় গত ২৫ মার্চ ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। তাদের লাশ ফেলে দেওয়া হয় সমুদ্রে। তাদের মুখটিও শেষবারের মতো দেখতে পাননি স্বজনরা। এর আগে ২০২০ সালের ২৮ মে লিবিয়ার মিজদা শহরে বন্দিশিবিরে আটকে রেখে ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়। গুলিবিদ্ধ হয়েও প্রাণে বেঁচে যান ১২ বাংলাদেশি। কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সি অবৈধ পথে তাদের লিবিয়ায় পাঠিয়েছিল। 

গত ২৫ মার্চ ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া ১৮ জনের একজন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের পাইলগাঁওয়ের আমিনুর রহমান। বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক হাবিবুর রহমান সমকালকে বলেন, দালালদের ‘মিষ্টিকথা’য় বিশ্বাস করে ১১ লাখ টাকার বিনিময়ে আমার ছেলে বিদেশ গিয়েছিল। তার লাশও আমাদের দেখার সুযোগ হয়নি।

বন্ধুর ফাঁদে তরুণ
তানভীর হোসাইন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা শেষ করে ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন ২০২৩ সালে। ২০২৫ সালের শেষের দিকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু আব্দুর রহমান সানি তাঁকে বেশি বেতনে কম্বোডিয়ায় কম্পিউটার শাখায় চাকরির প্রস্তাব দেন। সাত লাখ টাকায় সব ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন সানি। গত ১২ ডিসেম্বর কম্বোডিয়ার উদ্দেশে তানভীর ঢাকা ছাড়েন।

তানভীর জানান, তাঁকে যে স্ক্যাম সেন্টারে নেওয়া হয়েছিল সেখানে অন্তত ৫০০ তরুণকে অনলাইন প্রতারণামূলক কাজ করতে দেখেন তিনি। রাজি না হওয়ায় ‘ব্ল্যাকসেল’ নামে টর্চার সেলে নিয়ে তাঁকে নির্যাতন করা হয়। প্রাণ রক্ষায় দুদিন পর তিনি রাজি হন। এরপর তাঁকে ‘হানি ট্র্যাপ’ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেয় চীনা নাগরিকরা। কাজে যোগ দেওয়ার ১৭ দিনের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) সহায়তায় কম্বোডিয়ার পুলিশ দেশটির স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে অভিযান শুরু করে। তখন চীনা নাগরিকরা তাদের নিয়ে একটি জঙ্গলে আত্মগোপন করে।

সেখানে প্রায় তিন মাস আটকে থাকার পর মুক্তির শর্ত হিসেবে দেশে বাবার কাছ থেকে তিন লাখ টাকা সংগ্রহ করে চীনা নাগরিকদের দিতে হয় তানভীরকে। এরপর মুক্তি পেয়ে ২৩ মার্চ দেশে ফেরেন তিনি।

প্রয়োজন মানুষের সচেতনতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সমকালকে বলেন, মানব পাচার মামলায় অভিযুক্ত বা আসামিরা সহজে খালাস পেয়ে যায়। আইনি প্রক্রিয়ায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে না পারলে অবস্থার পরিবর্তন খুব কঠিন।

তিনি বলেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষকে আরও সচেতন করা প্রয়োজন। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি পাচারের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং পাচারকারী চক্রকে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

আরও পড়ুন

×