বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন
তাপপ্রবাহে ২০২৪ সালে দেশে ক্ষতি ২২ হাজার কোটি টাকা
গরমে কমছে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা, বাড়ছে অর্থনীতির ক্ষতি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ | ১০:০০ | আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২৬ | ১৩:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
অতিরিক্ত গরমে শ্রমের উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে এবং নষ্ট হচ্ছে বিপুল কর্মঘণ্টা। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে অতিরিক্ত গরমে উৎপাদনশীলতা কমে ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার ৮০ কোটি টাকা। এ ক্ষতি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান।
বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘এ লিভেবল ফিউচার: প্রটেক্টিং জবস অ্যান্ড গ্রোথ ফ্রম এক্সট্রিম হিট ইন সাউথ এশিয়াস সিটিজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গত বুধবার প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার নগরগুলোতে তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শ্রমবাজারের প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করার পর শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতার ক্ষতি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে, যেসব শ্রমিককে খোলা পরিবেশে বা পর্যাপ্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থা ছাড়া কাজ করতে হয়, তাদের কর্মক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে মানুষকে বেশি সময় বিশ্রাম নিতে হয়। এতে কাজের গতি কমে যায়, বাড়ে পানিশূন্যতা, হিট স্ট্রেস, মাথা ঘোরা ও বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতা। এর কারণে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন হ্রাস পায়। বিশ্বব্যাংক বলছে, এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ, অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মী, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুদের ওপর।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি ঢাকায়
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাজধানী ঢাকা। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বছরে ঢাকার প্রায় ৩ শতাংশ কার্যকর কর্মঘণ্টা হারিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরি হারানোর সমান। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৮০ সালের মধ্যে এ ক্ষতি দ্বিগুণের বেশি হতে পারে। তখন ঢাকার উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টার প্রায় ৭.৪ শতাংশ হারিয়ে যাবে।
প্রতিবেদন বলছে, দ্রুত নগরায়ণ, ঘনবসতি, কংক্রিটের বিস্তার, অপর্যাপ্ত সবুজ এলাকা এবং নগরের হিট আইল্যান্ডের প্রভাব ঢাকার পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
ঝুঁকিতে তৈরি পোশাকশিল্প ও নারী শ্রমিক
বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও চরম তাপপ্রবাহের কারণে বড় ঝুঁকির মুখে রয়েছে। প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) এবং কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের একটি বিশ্লেষণ উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তাপজনিত চাপ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাকশিল্প ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় হারাতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অতিরিক্ত গরমে শ্রমিকদের কাজের গতি কমে যায়, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সমস্যা হয় এবং উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, তাপপ্রবাহের প্রভাব নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে আরও গভীর। কারখানায় অতিরিক্ত গরমের কারণে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সমস্যা দেখা দিলে নারী কর্মীদের বিরুদ্ধে মানসিক চাপ, হয়রানি ও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মপরিবেশ নিরাপদ ও তাপসহনশীল না হলে নারী শ্রমিকদের কর্মজীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তীব্র গরম এরই মধ্যে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত করছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামোর ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, তাপপ্রবাহকে শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সরকারি নীতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পরিকল্পিত অর্থায়ন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং তাপসহনশীল নগর গড়ে তুলতে পারলে এ ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে, ২০১৬ সালে চালু হওয়া বাংলাদেশের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের মাধ্যমে পোশাক কারখানাগুলোকে জ্বালানি ও পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং উন্নত কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
আইএফসির সহায়তা ও টেকসই অর্থায়নের ফলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে পরিবেশবান্ধব রূপান্তরও জোরদার হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে ২৭০টির বেশি লিড সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানা ছিল।
দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রম উৎপাদনশীলতা হারিয়ে যাচ্ছে
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, চরম তাপপ্রবাহের কারণে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ শ্রম উৎপাদনশীলতা হারিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি প্রায় ৭ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। একই সময়ে এ অঞ্চলের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী প্রায় ২৮ কোটি বাড়বে। কিন্তু বাড়তে থাকা তাপমাত্রা কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।
প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৫২ কোটি মানুষ বছরে অন্তত এক মাস বিপজ্জনক মাত্রার তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হতে পারেন। বর্তমানে এ সংখ্যা এর প্রায় চার ভাগের এক ভাগ।
নীতিনির্ধারকদের জন্য সুপারিশ
প্রতিবেদনে নীতিনির্ধারকদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হলো তাপসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কার্যকর হিট অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা, নগর সবুজায়ন ও ছায়াযুক্ত উন্মুক্ত স্থান বৃদ্ধি, টেকসই শীতলীকরণ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা উন্নয়ন, সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা।
বিশেষজ্ঞদের মত
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, গরমের কারণে মানুষ অসুস্থ হয়, কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, উৎপাদন কমে যায়। অন্যদিকে মানুষ গরম থেকে বাঁচতে বৈদ্যুতিক পাখা, এয়ার কন্ডিশনারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনছে। এতে সাময়িকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও শেষ পর্যন্ত উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়াই বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশে দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিবেশ দূষণ তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। তিনি বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে শহর সম্প্রসারণ হলেও সেখানে পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা, উন্মুক্ত স্থান বা পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে ঢাকা ছাড়াও দেশের অন্যান্য শহরে তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এর শহরগুলোর ওপর। কিন্তু বাড়তে থাকা তাপমাত্রা কর্মসংস্থান, জীবিকা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তিনি বলেন, তাপসহনশীল শহর গড়ে তোলা শুধু মানুষকে গরম থেকে রক্ষা করার বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান রক্ষা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শহরগুলোকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে ধরে রাখারও বিষয়।
যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জলবায়ু সহনশীলতা প্রধান জন ওয়ারবারটন বলেন, দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে চরম তাপপ্রবাহ মানুষের জীবিকা ধ্বংস করছে, জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে, উৎপাদনশীলতা কমাচ্ছে এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটি একটি উন্নয়ন সংকট, যার মোকাবিলায় বিভিন্ন খাতে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
- বিষয় :
- বিশ্বব্যাংক