ঢাকা বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গ্রাফিতি

মুছে গেছে রং রয়েছে চিহ্ন

মুছে গেছে রং  রয়েছে চিহ্ন
×

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতি সংরক্ষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুরোনো গ্রাফিতি রং করার পাশাপাশি পুনর্লিখন হচ্ছে। গতকাল শনিবার বিকেলে- সমকাল

 দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪০ | আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘দেশটা কারও বাপের না’– রাজধানীর বনশ্রীর একটি আবাসিক এলাকার সড়কের দেয়ালে দুই বছর আগে এই বাক্য লেখা হয়। লেখাটি এখনও আছে, তবে অস্পষ্ট। তার ওপর সাঁটা হয়েছে বিভিন্ন পোস্টার। কয়েক কদম দূরে এক সময় ছিল আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে আঁকা দেয়ালচিত্র। সেখানে এখন নতুন রঙের প্রলেপ। নিউ ইস্কাটন রোডের বিয়াম স্কুলসংলগ্ন দেয়ালে বিবর্ণ হয়ে গেছে ‘বাংলাদেশ, জেন-জি’ গ্রাফিতিগুলো। কোথাও দেয়ালের রং উঠে গেছে, কোথাও শ্যাওলা ধরেছে, আবার কোথাও ভবন সংস্কারের কারণে পুরো দেয়ালে নতুন রং করা হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যে দেয়ালগুলো প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল, ২০২৬ সালে সেগুলোর অনেকটাই হারিয়ে গেছে। আর সেসব দেয়ালে লেখা কথা ও গ্রাফিতির মতো উচ্চারিত অনেক প্রত্যাশা এখন ঝাপসা মনে করছেন আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিক।
চব্বিশের ২৭ জুলাই। এদিন রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তি, মামলা প্রত্যাহার এবং দমন-পীড়নের প্রতিবাদে দেশব্যাপী গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। পরদিন থেকেই শিক্ষার্থীরা হাতে তুলে নেন স্প্রে পেইন্ট, রং ও তুলি।

পুলিশি নজরদারি, গ্রেপ্তার এবং হামলার শঙ্কা উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন শহরের দেয়ালে ফুটে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা। ‘লাশের সংখ্যা কত?’, ‘সম্পদের হিসাব পরে, লাশের হিসাব আগে’, ‘দিনে নাটক, রাতে আটক’, ‘পুলিশি হত্যার বিচার চাই’, ‘তোর কোটা তুই নে, আমার ভাইকে ফেরত দে’, ‘ধর্ম যার যার, দেশ সবার’, ‘দেশটা কারও বাপের না’, ‘এই পানি লাগবে, পানি’– এমন শত শত স্লোগান আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়। গুলিতে নিহত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মায়ের আহাজারি ‘হামার বেটাক মারলু ক্যান’ ছিল সবচেয়ে আলোচিত গ্রাফিতিগুলোর একটি। ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও দেয়ালগুলো হয়ে উঠেছিল এক-একটি জীবন্ত প্রতিবাদী মাধ্যম।

রাজধানীর শাহবাগ, টিএসসি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, মোহাম্মদপুর, মালিবাগ, সেগুনবাগিচা, রামপুরা, খিলগাঁও, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনও সেই সময়ের কিছু দেয়ালচিত্র দেখা যায়। তবে নতুন রং, পোস্টার, ধুলাবালু ও সময়ের প্রবাহে সেগুলো অস্পষ্ট হয়ে গেছে। 

বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা জামশেদ আহমেদ বলেন, ‘দেয়ালে হাত দিয়ে যে ইতিহাস অনুভব করা যেত, সেটা আর থাকবে না। আমরা জানিও না কারা এগুলো এঁকেছিল। তবে বুঝতে পেরেছিলাম, তারা দেশ বদলাতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা কি আদৌ তা পেরেছে?’ একই এলাকার বাসামালিক কায়সার আলী ভাষ্য, নির্দিষ্ট সময় পরপর ভবনের দেয়ালে রং করতেই হয়। তাই অনেক গ্রাফিতি মুছে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন।

নিউ ইস্কাটনের বাসিন্দা নীলুফার জাহান বলেন, ‘আন্দোলনের সময় এলাকার শিক্ষার্থীদের রংতুলি কেনার জন্য স্থানীয়ভাবে সহায়তা করেছিলেন তারা। এখন সেই শিক্ষার্থীদের অনেকেই এসে বলেন, যে পরিবর্তনের আশা করেছিলেন, তার অনেকটা এখনও পূরণ হয়নি।’

গ্রাফিতি পুনর্লিখনে অংশ নেন চারুকলার শিক্ষার্থীরা	সমকাল

একই হতাশার কথা শোনা যায় ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মুখে। তিনি বলেন, ‘স্প্রে পেইন্ট হাতে নিয়ে মনে হয়েছিল, নতুন বাংলাদেশ দেখব। কিন্তু দুই বছর পরও হত্যাকাণ্ডের বিচার ও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের অনেক বিষয়ই আমরা দেখতে পাইনি। সেই স্বপ্ন এখন অনেকটাই ফিকে মনে হয়।’
জুলাইয়ের দেয়ালচিত্র, গ্রাফিতির বই, ডিজিটাল ও ব্যক্তিগতভাবে সংরক্ষণ করেছেন অনেকেই। বাংলাদেশ ফ্রি প্রেস ইনিশিয়েটিভের যুগ্ম আহ্বায়ক সিলমী সাদিয়া বলেন, ‘২০২৪ সালের আন্দোলনে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা গ্রাফিতি এঁকেছিলাম, এখন তা ধীরে ধীরে শ্যাওলাধরা দেয়ালের মতোই ফিকে হতে শুরু করেছে। তবে জুলাইয়ের গ্রাফিতি, গান, স্লোগান ও কবিতার আর্কাইভ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাসের দলিল হয়ে থাকবে।’

সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রতীক দ্রোহযাত্রা
আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত ২ আগস্টের ‘দ্রোহযাত্রা’। সেদিন রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, শিক্ষক নেটওয়ার্ক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, নাগরিক প্ল্যাটফর্মসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে জনসমুদ্র সৃষ্টি হয়েছিল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেই মহাসমাবেশ শেষে জনস্রোত কদম ফোয়ারা, হাইকোর্ট মোড়, দোয়েল চত্বর ও টিএসসি হয়ে পৌঁছায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।

শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেখান থেকে ধ্বনিত হয়েছিল গণগ্রেপ্তার বন্ধ, বিচার এবং স্বৈরাচারী সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি। দ্রোহযাত্রার ঠিক পরদিনই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের এক দফা ঘোষণা আসে।
দ্রোহযাত্রায় অংশ নেওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাবাসসুম নায়রা সেসব দিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘সেদিন শুধু জানতাম শহীদ মিনারে যেতে হবে। সেখানে গিয়ে মনে হয়েছিল, আর পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। আমরা ভেবেছিলাম, নতুন একটি দেশের পথ তৈরি হচ্ছে। দুই বছর পর এসে নিজের কাছেই প্রশ্ন করি– আমরা কতটা পেলাম?’
একই সুর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ও সচেতন নাগরিকদের কণ্ঠে। ফ্রিল্যান্সার তরুণ আহমেদ বলেন, ‘যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সাধারণ জনগণ এই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছিল, তার কোনো কার্যকর প্রতিফলন আজ পর্যন্ত তারা উপলব্ধি করতে পারেননি।’

 

আরও পড়ুন

×